প্রতি বছর ১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক মর্যাদার দাবি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এই প্রাপ্তির ইতিহাসের আড়ালে আজও একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা রয়ে গেছেশিশুশ্রম। যখন আমরা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলি, তখন শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত হওয়ার বিষয়টি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার কথা। মে দিবসের চেতনা তাই পূর্ণতা পায় না যদি শিশুশ্রমের মতো নির্মম বাস্তবতা আমাদের সমাজে বিদ্যমান থাকে।
শিশুশ্রম মূলত দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্যের একটি করুণ প্রতিফলন। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচেতে অসংখ্য শিশু এখনো জীবিকার তাগিদে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। কেউ কাজ করছে হোটেলে, কেউ মোটরবাইকের গেরেজে, কেউ ইট ভাটায়, কেউবা চালনা করছে হালকা বা ভারী যান। তাদের হাতে বইয়ের বদলে উঠে যাচ্ছে কাজের সরঞ্জাম। অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়ছে ভারী বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। শৈশব যা হওয়া উচিত খেলাধুলা, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার সময়, তা পরিণত হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম ও অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনে।
আইনগতভাবে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হলেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই, কিংবা প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যেখানে নজরদারি প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে শিশুদের শোষণ চলতেই থাকে নীরবে। বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
শিশুশ্রম শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটও। স্বল্প মজুরিতে শিশুদের কাজে লাগানো অনেক সময় মালিকদের জন্য লাভজনক মনে হতে পারে কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজের জন্য ক্ষতিকর। যখন একটি শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় তখন সে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। ফলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
মে দিবসের মূল শিক্ষা হচ্ছে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু শিশুদের শ্রমে বাধ্য করা এই চেতনার পরিপন্থী। শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা ও সুস্থ শৈশব। এ জন্যই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে স্থান, জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ পিছে, চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল। এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
এই কবিতায় কবি এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছেন যেখানে পুরোনো অন্যায়, জীর্ণতা ও অমানবিকতা সরিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান রয়েছে।
শিশুশ্রম নিরসনে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাজের বদলে স্কুলে পাঠাতে হলে তাদের আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। উপবৃত্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা ও পুষ্টিকর খাদ্য কর্মসূচি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগে কঠোরতা বাড়াতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি শিশুদের কাজে নিয়োজিত করে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজ শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়; যা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। স্কুলকে শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় ও সহজলভ্য করতে না পারলে তারা পড়াশোনায় আগ্রহ হারায়। বিশেষ করে প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা বা কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে যাতে তারা ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
এখানে বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম এবং সমাজের সচেতন নাগরিকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা, ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের পুনর্বাসন এবং তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গণমাধ্যম এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে এবং অনিয়ম তুলে ধরতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মে দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। যআমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে শিশুরা শৈশব হারিয়ে শ্রমে নিযুক্ত হবে, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে তারা শিক্ষা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সম্মিলিতভাবে খুঁজে নিতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এই উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা হবে সবার জন্য সমান সুযোগের ভিত্তিতে। শিশুশ্রমের অবসান ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আজকের মে দিবসে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরী, কাজের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা, মজুরী বৈষম্য দূরীকরণ যেমন জরুরী শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশ নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।
সবশেষে বলা যায়, মে দিবসের চেতনা কেবল শ্রমিকদের অধিকারেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবিক সমাজ গঠনের একটি অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে আমাদের আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। শিশুদের হাতে কাজ নয়, তুলে দিতে হবে বই ও স্বপ্ন। তাহলেই আমরা সত্যিকারের অর্থে মে দিবসের চেতনাকে ধারণ করতে পারব।
কেকে/এমএ