রাজধানীতে কুরবানির পশুর হাটকে ঘিরে এবার প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের পাশাপাশি তৎপর হয়ে উঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ফলে হাটের ইজারা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, দখলবাজি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন—পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাত ঘটতে পারে, যার প্রভাব পড়বে নতুন সরকারের ওপরও।
নিউমার্কেট এলাকায় খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডে এ অস্থিরতা আরও তীব্র হয়েছে। নিহতের বড় ভাইয়ের দাবি—কোরবানির হাটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করেই টিটন পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি জানান—মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং পশুর হাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই তার ভাইকে হত্যা করে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল। গতকাল শনিবার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
নিহতের ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার অভিযোগ করেন—ঘটনার পর পিচ্চি হেলাল একটি অডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন, যাতে তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। তিনি বলেন, তাদের পরিবারের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই এবং হেলাল নিজের অপরাধ আড়াল করতেই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযুক্তের সব ফোন জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার দাবি জানান এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে গণমাধ্যমে দেওয়া এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে অভিযুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল টিটন হত্যার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এ বিষয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, গত এক মাসের মধ্যে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।
পিচ্চি হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘তাহলে টিটনের শত্রু কে? টিটনই বলে গেছে যে ইমন ওকে মারতে চায়। পারিবারিকভাবে ওর সমস্যা আছে। টিটনের নিজের পরিবারের মধ্যেই বিরোধ ছিল। তার বোন ও বোন জামাইয়ের (ইমন) সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। তারা দুজনই চেয়েছিল টিটন মারা যাক। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি।’
পিচ্চি হেলাল তার বক্তব্যে আরও বলেন, এখন প্রযুক্তির যুগে সবকিছুই যাচাই করা সম্ভব। তার দাবি অনুযায়ী, এজাহারে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে—হাটের ইজারা বা পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে টিটনের দ্বন্দ্ব ছিল, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। টিটন ও তার ভাই রিপনের ফোন ফরেনসিক করলে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। গত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের কথোপকথন হয়নি।
হাটের ইজারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিটন আদৌ কোনো শিডিউল নিয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের রেকর্ড যাচাই করলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। ‘আমার জানামতে, ওর তো এসব ঝামেলায় আসার কথা না।’
যমুনা টিভিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে পিচ্চি হেলাল বলেন, তখন টিটন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং সেই সময় আমরা একসঙ্গে ছিলাম।
পিচ্চি হেলাল দাবি করেন—ঢাকা শহরে এখন একদম দোর্দণ্ডপ্রতাপে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে ইমন। ‘মিরপুরে ফোরস্টার গ্রুপ, আর এদিক থেকে পুরান ঢাকা পর্যন্ত যদি ধরেন, তাহলে ইমন-রিলেটেড। কী পরিমাণ চাঁদা ইমন তোলে, তা জানলে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে। সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ইন্টারনেট, ডিশ ব্যবসা, ময়লার ব্যবসাসহ সব একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ চায় বা নিচ্ছে ইমন। সে সবকিছু করছে সব জায়গায়, কিন্তু এখন টোটালি সিন আউট। ও সিনের মধ্যেই নেই।’
এদিকে কুরবানির হাটের ইজারা নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১১টি অস্থায়ী পশুর হাটে দেখা গেছে—বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি জামায়াত নেতারাও হাট ইজারা নিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে বেড়েছে প্রতিযোগিতাও।
যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত হাটটির সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক কোটি টাকা কম। কিন্তু বাস্তবে দর উঠেছে ৪ কোটিরও বেশি। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য হাটেও। কোথাও কোথাও সিন্ডিকেটের কারণে দরপত্র জমা না পড়লেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে একাধিক রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
দরপত্র সংগ্রহকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা পরিস্থিতির উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই প্রভাব বিস্তার করতে সক্রিয় রয়েছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো, যারা হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে মাঠ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাট-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন—পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাদের আশঙ্কা, চাঁদাবাজি বাড়বে, নিরাপত্তাহীনতায় ক্রেতা কমে যেতে পারে এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে উঠবে।
ডিএসসিসির একাধিক সূত্র জানায়—ঊর্ধ্বতন নির্দেশনায় হাটের সরকারি মূল্য কমানো হয়েছিল, তবে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ায় দরপত্রে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি মূল্য ও বাস্তব দরপত্রের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা গোয়েন্দা নজরদারিতে:
এদিকে জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের মুখপাত্র এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
র্যাব জানায়, প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যার ঘটনার ছায়া তদন্ত চলছে।
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নিউমার্কেটে দুর্ধর্ষ হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীদের শনাক্ত করতে র্যাবের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। টিটন হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ছায়া তদন্ত করছি।
সম্প্রতি বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে র্যাবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, শুধু টিটন হত্যাকাণ্ডের খুনিরাই নয়, বরং যারা জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের প্রত্যেককেই কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।
র্যাব আরও জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ যেকোনো পর্যায়ের অপরাধী যাতে নতুন করে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে র্যাব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কেকে/এলএ