বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যখন কিষাণ-কিষাণির ঘরে নতুন ধানের গন্ধে ম ম করার কথা ছিল, তখন আজ হাওরজুড়ে কেবল হাহাকার আর বিষণ্নতার সুর। সুনামগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা থেকে মৌলভীবাজার হাওরের সাতটি জেলার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ আজ অথৈ পানির নিচে। মাইলের পর মাইল আধাপাকা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে, আর সেই পচা ধানের গন্ধ ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে নিঃস্ব কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। আবহাওয়া পূর্বাভাস বলছে, বৃষ্টির এই ধারা আরও কিছুদিন চলবে। তার মানে, যা একটু অবশিষ্ট আছে, তাও হয়তো শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যাবে না।
এই সংকটকে প্রতিবছরের মতো ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বা ‘নিয়তি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা আমাদের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আছে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, এই বিপর্যয়ের পেছনে প্রকৃতির চেয়ে মানুষের অবহেলা আর ভুল পরিকল্পনা কোনো অংশে কম দায়ী নয়। এবারের সংকটের সবচেয়ে আলোচিত এবং যন্ত্রণাদায়ক দিকটি হলো বীজ।
কৃষকদের অভিযোগ, তাদের যে ‘ব্রি-৮৮’ জাতের ধান দেওয়া হয়েছিল, তা পরিপক্ব হতে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২৩ দিন বেশি সময় নিয়েছে। হাওরের মানুষের কাছে এই ২৩ দিন মানে হলো জীবন আর মরণরেখা। যদি ধানটি সময়মতো পাকত, তবে বৃষ্টির আগেই তা কৃষকের ঘরে উঠত।
প্রশ্ন জাগে, এই বীজ সরবরাহের আগে কি এর জীবনচক্র সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল? কারিগরি এই ভুলের দায় কে নেবে? এই এক ভুল বীজের কারণে আজ লাখো কৃষক পথে বসার উপক্রম হয়েছে। এর জন্য একটি স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া কি খুব বেশি চাওয়া?
এরপর আসা যাক হাওর রক্ষা বাঁধের কথায়। প্রতিবছর কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বাঁধগুলো কি আসলে ফসল রক্ষা করছে, নাকি জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে দিচ্ছে? মাঠের মানুষের সাথে কথা বললে জানা যায়, অপরিকল্পিতভাবে মাটি ফেলার কারণে হাওরের পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি বের হতে পারছে না। আবার নদীর পানি বাড়লে সেই নড়বড়ে বাঁধগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বাঁধের পিআইসি গঠন নিয়ে দলাদলি, বরাদ্দ নিয়ে লুটপাট আর নিম্নমানের কাজের গল্পগুলো এখন ওপেন সিক্রেট। বছরের পর বছর এই অনিয়ম চললেও কারও কোনো শাস্তি হয় না, জবাবদিহিতা থাকে না। এই দুর্নীতির খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সেই প্রান্তিক কৃষককে, যার কাছে বোরো ধানই বছরের একমাত্র সম্বল।
শ্রমিক সংকট আর আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জলাবদ্ধতার কারণে হারভেস্টার চালানো যাচ্ছে না, আবার শ্রমিকের মজুরিও সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে চোখের সামনে ফসল তলিয়ে গেলেও তা ঘরে তোলার কোনো উপায় থাকছে না।
হাওরের কৃষকেরা ত্রাণ চান না, তারা তাদের পরিশ্রমের ফসল নিরাপদে ঘরে তুলতে চান। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে আমাদের পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় জাতের ধান, যা একসময় গভীর পানিতে টিকে থাকতে পারত, সেগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতা আনা এবং কৃষকদের হাতে সময়মতো সঠিক উপকরণ পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।
হাওরের এই ক্ষতি কেবল কৃষকের একার নয়, এটি আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও এক বড় আঘাত। পানির নিচে কেবল ধান তলিয়ে যায়নি, তলিয়ে গেছে একটি পরিশ্রমী জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার সম্বল। এই নীতিগত ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে প্রতি বছরই আমাদের একই দৃশ্যের সাক্ষী হতে হবে। আর কতবার আমরা কৃষকের এই স্বপ্নভঙ্গ চেয়ে চেয়ে দেখব? এখন সময় এসেছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার।
কেকে/ এমএস