মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বিনাশী পথে বিশ্ব রাজনীতি
মোতাহার হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ১১:৪০ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

যুদ্ধ কখনো মানব জাতির জন্য শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। যুদ্ধে সম্পদ, জান-মালের ক্ষতি হয়। এসব জেনেও মানুষ, দেশ, সরকার যুদ্ধে জড়ায়। কখনো কখনো মানুষ যুদ্ধে জড়ায় নিজ ভূখণ্ড রক্ষায়, নতুন দেশ, নতুন মানচিত্র সৃষ্টি, সাম্রাজ্য দখল, প্রতিষ্ঠা, আধিপত্য, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সম্পদ দখল প্রভৃতি কারণে। 

বর্তমানে ইউক্রেন রাশিয়া, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন, ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে আবার যুক্তরাষ্ট্রকে ঘায়েল করতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, আবুধাবি, বাহরাইন, কাতারের বিভিন্ন স্থাপনাসহ সেসব দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে ইরান উপর্যপরি হামলা চালায়। এসব পাল্টা হামলায় উভয়পক্ষ পারমাণবিক অস্ত্রসহ মসাইল ও ড্রোন ব্যবহার করে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে ইরানের ওপর হামলা চালায়। মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা বা সরে আসা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ সমমনা কয়েকটি দেশ উদ্বেগ জানিয়ে এলেও তাতে কর্ণপাত করেনি ইরান। উপরন্ত ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও মজুত থেকে না সরে বরং অতিমাত্রায় শক্তি বাড়াতে থাকে। এর পেছনে ইরানের লক্ষ্য ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। 

তবে রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধ অপেক্ষা ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এ যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে, অর্থনীতি এবং মানুষকে বেশি মাত্রায় সংকটে ফেলেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ যুদ্ধের অভিঘাত হানা দিয়েছে। তদুপরি সুদানে গৃহযুদ্ধ ও জাতিগত সংঘাত, ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা বিশেষ করে কাশ্মীর নিয়ে, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, ইথোপিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত (গৃহযুদ্ধ), চীন-তাইওয়ানের মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে উত্তেজনা, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা, আরমেনিয়া-আজারবাইজানের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। এসব কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

অবশ্য ইরানের এ যুদ্ধ হঠাৎ হয়নি, এর পেছনে অনেক দিনের উত্তেজনা ছিল : ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর উত্তেজনার শুরু। প্রথম হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন। ইরান পাল্টা হিসেবে : বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও তেল স্থাপনায় আঘাত করে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এতে জড়িয়ে পড়ে। এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। 

একইসঙ্গে বহু শহর ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়। বিমান চলাচল ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি বিশ্বে জ্বালানি তেল, এলএনজি, এল পিজির মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ সাগরপথে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ইরানের ‘হরমুজ প্রাণালি’ বন্ধ থাকায় বিশ্বে সব রকম জ্বালানির মূল্য বাড়ছে, বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।

এমনি এক অস্থির সময়ে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অস্ত্র মজুত ও বিক্রি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি বার্তা সংস্থা এ ধরনের উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে। মূলত বিশ্বে বাড়তে থাকা যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয় নতুন রেকর্ড গড়েছে। এ খাতে বছরে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার, যা টানা একাদশ বছরের মতো বৃদ্ধি পেল। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

তথ্যমতে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতাই এ ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ। সামরিক ব্যয়ে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া এ তিন দেশের সম্মিলিত ব্যয়ই বৈশ্বিক মোট ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি, প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার।

২০২৫ সালে মোট সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে বড় ব্যয়কারী দেশগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম যুক্তরাষ্ট্র, যারা এ বছর কিছুটা ব্যয় কমিয়েছে। সিপ্রির গবেষক লরেনৎসো স্কারাৎসাতো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘাটতি মূলত ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর বাড়তি ব্যয়ে পূরণ হয়েছে। বিশ্বের জিডিপির তুলনায় সামরিক ব্যয়ের অনুপাতও ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্কারাৎসাতোর ভাষায়, ‘বিশ্ব এখন নিজেকে আগের চেয়ে বেশি অনিরাপদ মনে করছে, আর সেই কারণে দেশগুলো অস্ত্র সংগ্রহে ঝুঁকছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে সামরিক খাতে ব্যয় করেছে ৯৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম। এর বড় কারণ, ইউক্রেনকে নতুন সামরিক সহায়তা অনুমোদন না হওয়া। তবে এ নিম্নগতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে এবং ২০২৭ সালে তা আরও বাড়তে পারে।

ইউরোপে সামরিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এ অঞ্চলের ব্যয় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তা কমে আসার আশঙ্কাও ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদারে উৎসাহিত করছে। জার্মানি ২০২৫ সালে ১১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় করে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। স্পেনের সামরিক ব্যয়ও ৫০ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন দুই দেশেই যুদ্ধের কারণে সামরিক ব্যয় বেড়েছে। রাশিয়ার ব্যয় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৯ হাজার কোটি ডলার। এটা দেশটির জিডিপির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
 
অন্যদিকে ইউক্রেন ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ হাজার ৪১০ কোটি ডলারে উন্নীত করে। যা তাদের জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও সামরিক ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে সামরিক ব্যয় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এ অঞ্চলে চীন প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে দেশটির সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশগুলোও প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াচ্ছে। জাপান ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ২২০ কোটি ডলারে নিয়ে গেছে, যা ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ। তাইওয়ানও ১৪ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে।

ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বিশ্ব এখন অনিরাপদ। এ কারণে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র মজুত বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে শক্তিধরদের অস্ত্র মজুতে বিশ্বে শান্তি বিঘ্নের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। প্রত্যাশা অস্ত্র মজুত বা সংগ্রহ না বাড়িয়ে ওই অর্থে বিশ্বের দরিত্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ও মানবকল্যাণে ব্যয় করা হোক। তাহলে বিশ্ব সংঘাতমুক্ত থাকবে। মানুষ শান্তিতে বসবাস করার নিশ্চয়তা পাবে।

 লেখক : সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম 

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close