মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট
মানবসম্পদ ও টেকসই উন্নয়নে অগ্রাধিকার
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ৯:৩৩ এএম আপডেট: ০৫.০৫.২০২৬ ৯:৩৮ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য নিরসনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের উন্নয়ন এবং তাদের সেবার মান ও পরিধি বৃদ্ধিতে বিশেষ বরাদ্দ থাকছে। সরকারের লক্ষ্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠন করা।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং এ-সংক্রান্ত সহায়ক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের বিষয়টিকেও বাজেট কাঠামোর অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে সংগতি রেখে পরিচালনা ও উন্নয়ন ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে। এছাড়া বাজেট বরাদ্দের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রস্তাবিত ব্যয় তাদের নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করলে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দিয়ে শুধুমাত্র উচ্চ অগ্রাধিকারসম্পন্ন প্রকল্পগুলোকে অর্থায়ন করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আগামী বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। তবে বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, ইরান-ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানাপোড়েনের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব দেশীয় অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা করছে সরকার।

সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নও বাজেটের বড় অংশজুড়ে থাকবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে তা ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে ব্যয় ও দুর্বল রাজস্ব প্রবাহের কারণে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া চলতি বাজেটে ঘোষিত সামাজিক কর্মসূচিগুলোর পাশাপাশি নতুন কিছু উদ্যোগ যুক্ত হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং খালকাটা কর্মসূচির জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে মোট অতিরিক্ত ব্যয় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতেই প্রথম ধাপে প্রায় ৪০ লাখ পরিবার অন্তর্ভুক্ত হবে, এবং এতে ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। ভবিষ্যতে এটি এক কোটি পরিবারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। কৃষক ও স্বাস্থ্য কার্ডেও বড় অঙ্কের ব্যয় হবে। এছাড়া নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি আরও বাড়তে পারে।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও গতিশীল করার লক্ষ্য নিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩১.৪ শতাংশ বিনিয়োগে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪.৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬.৫ শতাংশ বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থ বিভাগ মনে করছে, এই লক্ষ্য অর্জন হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং উৎপাদন ও রফতানি খাতেও গতি আসবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। অবকাঠামো, যোগাযোগ, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এই ব্যয়ের বড় অংশ যাবে। এডিপি বরাদ্দের দিক থেকে বরাবরের মতোই শীর্ষে থাকছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে এবার প্রকল্প নির্বাচনে কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কারণ অতীতে অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ না হওয়ায় খরচ বেড়েছে এবং প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।

বাজেট ঘাটতি ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশের কাছাকাছি। এ ঘাটতি পূরণে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হতে পারে। বিদেশি উৎস থেকে আরও প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা আসতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতায় জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্যঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে দ্রুত ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ বাস্তবতায় বাজেটে প্রয়োজন জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি, যাতে বাজারে হঠাৎ ধাক্কা কমে। সর্বজনীন ভর্তুকির বদলে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দিতে হবে—কৃষি, গণপরিবহন ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য। কর আদায় বাড়িয়ে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিদ্যুৎ খাতের অপচয় কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা দরকার, যাতে হঠাৎ সংকট সামাল দেওয়া যায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি হওয়া উচিত একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি। বাজেট বিনিয়োগবান্ধব, জনকল্যাণমুখী ও কর্মসংস্থানমুখী হওয়া উচিত, যেখানে রাজস্ব আদায়ের চেয়ে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতাই হবে মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের আগে অর্থনীতিকে সুস্থ করা জরুরি। কারণ অর্থনীতি অসুস্থ থাকলে এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারবে না। কর নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। হুটহাট এসআরও জারি করে করের হার পরিবর্তন করা বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর।

ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, এই খাত বর্তমানে ‘তলানিতে’ গিয়ে ঠেকেছে। পাচার হওয়া টাকা ফেরত না আসা পর্যন্ত এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও আস্থা না ফিরলে বিনিয়োগ বাড়বে না। সরকারকে প্রয়োজনে বাজেটের টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে হবে এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

সরকারি বিনিয়োগের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে আবদুল মজিদ বলেন, উদ্ভট বা অপ্রয়োজনীয় হাই-রাইজ বিল্ডিং বা বড় বড় ব্রিজ নির্মাণ না করে এমন খাতে বিনিয়োগ করতে হবে যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষকে বেসরকারি ক্লিনিক বা কোচিং সেন্টারে অতিরিক্ত খরচ করতে না হয়।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:   অর্থবছর   বাজেট   মানবসম্পদ   উন্নয়ন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close