ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিশ্চিত করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিজেপির জয়ে রাজ্যজুড়ে সহিংসতা, সংঘাত এবং বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। সেইসঙ্গে ভারতে অবস্থানরত বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ’ তকমা দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) শুধু বাংলাদেশি নয়, বরং রোহিঙ্গা বা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দাবি করে মানুষকে পুশইন করছে। এই পরিস্থিতিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সরকারও এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মধ্যেই সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তৎপরতা বাড়িয়েছে বিজিবি। গত সোমবার রাতেই বিজিবি সদর দপ্তর থেকে এ তথ্য জানানো হয়। এ ছাড়া বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিজিবি জানায়, সীমান্ত এলাকা দিয়ে যে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ রোধে সদা তৎপর রয়েছে বিজিবি। যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে সীমান্তের দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের পর কোনো ‘পুশইনের’ ঘটনা ঘটলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গতকাল দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল এবং এর ফলে সম্ভাব্য ‘পুশইন’ পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ড. খলিলুর রহমান সাফ জানিয়ে দেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যদি কোনো ধরনের পুশইনের ঘটনা ঘটে, তবে ঢাকা তার পাল্টা ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চীন ও ভারতের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা ভারত থেকে বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করে পুশইন করার প্রক্রিয়াকে অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত সংযোগস্থল। ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও প্রতিফলিত হতে পারে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে অবস্থানরত নাগরিকদের সীমান্ত দিয়ে জোর করে ঠেলে পাঠানো বা পুশইন করা সীমান্ত এলাকার স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
অনুপ্রবেশ ইস্যু
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের লাগোয়া এই রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এর আগে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু এবং ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যাদের একটি বড় অংশ মুসলিম। বাদ দেওয়া ওই ভোটারদের বলা হচ্ছে, তারা অনুপ্রবেশকারী। এ নিয়ে দুই মাস ধরে তীব্র বাদানুবাদ চলছে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে। তৃণমূল বলছে, এরা তৃণমূলের ভোটার এবং মোদি সরকার বেছে বেছে বিশেষ গোষ্ঠীর লোকদের বাদ দিয়েছে। এ বিষয়টি নির্বাচনপূর্ব সময় থেকেই সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর পদক্ষেপের অঙ্গীকার করেছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের পর অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করে বহিষ্কার করা হবে’।
অন্যদিকে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তাদের এই বক্তব্য এবং বিজেপির বিজয়ের পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বাঙালিদের সীমান্ত দিয়ে পুশইন করার শঙ্কা বেড়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর দিনাজপুর জেলার সঙ্গে বাংলাদেশের দিনাজপুর, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও রাজশাহী অঞ্চলের সরাসরি সীমান্ত সংযোগ থাকায় এসব এলাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। হিলি স্থলবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গে ‘অবৈধ মুসলিম ভোটার’ বিষয়ে নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) আশরাফুজ্জামান খান বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া এবং তাদের অধিকাংশ মুসলিম হওয়ায় মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট তৈরি হতে পারে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নতুন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এসব মানুষকে ‘পুশইন’ করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে, যা রোহিঙ্গা সংকটের মতো আরেকটি জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। এ অবস্থায় সীমান্তে বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এ বিষয়ে মেজর জেনারেল (অব.) রোকন উদ্দিন বলেন, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য—নদী, জলাভূমি ও দুর্গম এলাকা—সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তোলে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে মানবিক ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা উপেক্ষা করা হলে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকলে সীমান্তে শান্তিশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব।
দুই সহস্রাধিক ব্যক্তিকে পুশইন
২০২৫ সালের মে মাস থেকে শুরু করে ভারত থেকে কয়েক দফায় অবৈধভাবে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশইন বা জোরপূর্বক প্রবেশ করানোর ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, এই সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৫-২০২৬ সালের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ২,৪৭৯ জন ব্যক্তিকে পুশইন করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। যাদের পুশইন করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকেই ভারতীয় নাগরিক, রোহিঙ্গা এবং দীর্ঘকাল ধরে ভারতে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলিম।
কেকে/এলএ