উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ ১৩টি উপজেলায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ সরকারি এই হিসাবের চেয়ে আরও কয়েকগুণ বেশি।
বুধবার (৬ মে) কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী জেলার অন্তত ৫০ হাজার কৃষক সরাসরি এই ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরের শ্রমজীবী মানুষ।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে জেলার মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১১ হাজার ১৭৪ হেক্টর। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৯ হাজার ৭১৫জন কৃষক। ক্ষতিকর পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির হয়েছে জেলার হাওরাঞ্চলে। তারমধ্য ইটনা উপজেলা ১১ হাজার ৫০টি পরিবারের ৩ হাজার ২৬১ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৭৫ কোটি ৫৮ লাখ ২০০০টাকা, অষ্টগ্রাম উপজেলা ৯ হাজার ১৫০টি পরিবারের ২ হাজার ৭০৩ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৬২ কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা, তাড়াইল উপজেলা ৪ হাজার ৬৪৪টি পরিবারের ১ হাজার ২২৪ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ২৮ কোটি ৩৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, নিকলী উপজেলা ৪ হাজার ২৬০টি পরিবারের ৯২৩ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৩হাজার টাকা, করিমগঞ্জ উপজেলা ৭ হাজার ৩০০টি পরিবারের ৮৩০ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ১৯ কোটি ২৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
এছাড়াও মিঠামইন উপজেলা ৩ হাজার ৫০০ পরিবারের ৬৯০ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ১৫ কোটি ৯৯ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, কটিয়াদী উপজেলা ৩ হাজার ২৫০টি পরিবারের ৫৮৫ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, সদর উপজেলা ১ হাজার ৯২৫টি পরিবারের ২৭৫ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৬৮০০হাজার টাকা, ভৈরব উপজেলা ১ হাজার ২৯০টি পরিবারের ২১১ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৫হাজার টাকা, বাজিতপুর উপজেলা ১ হাজার ২৯৬টি পরিবারের ১৬২ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা, কুলিয়ারচর উপজেলা ৪৫০টি পরিবারের ৬৫ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ১৫ লাখ ৬৫হাজার ১০০ টাকা ও হোসেনপুর উপজেলা ২৬০টি পরিবারের ৪৭ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ১০ লাখ ৮৭হাজার টাকা।
তবে স্থানীয়রা জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েকগুণ বেশি। প্রকৃত তথ্য কৃষি বিভাগের জরিপে উঠে আসেনি বলে দাবি অনেক কৃষকের। হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি যেতে পারছে না। পানি যাওয়ার পথগুলো পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে।
হাওড়ের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজো হয়ে রয়েছে। যার কারণে এবার বন্যা না হলেও হাওরের হাজার হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মূল কারণ এখনই উদঘাটন না করা গেলে ভবিষ্যতে আরও এমন পরিস্থিতি শিকার হতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন হাওরে পানি আসার সময়। তবে এবার বন্যা না হয়েও বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে গেছে ধানের জমি। স্বাভাবিক। অবশ্য ঢলের কোনো পানি হাওরের তেমনভাবে আসেনি। এছাড়া এবার ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকেরা হার্ভেস্টার দিয়ে সহজে ধান কটতে পারেননি।
অন্যান্য বছর কৃষকেরা নরসিংদী, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, পাবনা, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কাটার শ্রমিক আসতো। তারা হাওরে জিরাতি হয়ে ধান কাটতেন। কিন্তু হার্ভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এবার শ্রমিকও কম এসেছে। আবার খেতে পানি জমায় হার্ভেস্টারের মাধ্যমেও ধান কাটা যাচ্ছে না। হাওর থেকে দেরিতে পানি নামায় কৃষকদের বীজতলা প্রস্তুত করতেও দেরি হয়। তাই ধানের চারাও দেরিতে লাগানো হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের জরিপে মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি উঠে আসেনি। অনেক এলাকায় শতভাগ ফসল তলিয়ে গেলেও সরকারি তালিকায় তার প্রতিফলন নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা ও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন জেলার ভুক্তভোগী কৃষকরা।
জানা যায়, বোরো ফসলকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই কৃষকদের মধ্যে আনন্দ-উদ্দীপনার অদ্ভুত শিহরন জেগে ওঠে। বোরো মৌসুমে জিরাতির সমাগমও বেড়ে যায়। যারা কৃষকের জমি টাকার বিনিময়ে পত্তন নিয়ে চাষ করেন তাদেরকে বলা হয় জিরাতি। এই জিরাতিরা আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। তারা ফসল কাটার মওসুমে জমির পাশে ছোট ছোট অস্থায়ী ঘর তুলে সেখানে রাত্রিযাপন করেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন প্রয়োজনীয় সংখ্যক কৃষিশ্রমিক। এই সকল জিরাতি ও কৃষিশ্রমিকেরাও এ মওসুমে প্রচুর ধান পেয়ে থাকেন।
এছাড়া এই মৌসুমী ধানের বিনিময়ে কৃষকের জমিতে ধানকাটার জন্য সুদূর ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, শেরপর, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা থেকেও দরিদ্র কৃষিশ্রমিকেরা হাওরের বিভিন্ন উপজেলায় এসে অস্থায়ী ডেরা তুলে বসবাস করেন। মৌসুমের শেষে ধানকাটার পারিশ্রমিক হিসেবে এরাও পেয়ে থাকেন প্রচুর পরিমাণ ধান। প্রতি বছর চৈত্র-বৈশাখ এলেই কৃষকদের মধ্যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশংকা কাজ করে। ঘরে ফসল না তোলা অবধি তারা আশংকামুক্ত হতে পারেন না। এবার কৃষকেরা সে আশংকায় কেড়ে নিল তাদের সপ্নের ফসল।
কৃষকরা জানান, জমিতে ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, ধান বিক্রি করে তা দিয়ে পোষায় না। বর্তমানে অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছ, যা বাঁচানো গেছে, তা-ও আধাপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। এখন সেই ধান তিনি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ টাকা মণে। উৎপাদন খরচের হিসাবে যা মণে ৩০০-৪০০ টাকায়। এতে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা জানান, ভেজা ধান কেনার পর তাদের শুকাতে হচ্ছে। তাই বর্তমানে ধানের দাম কম। হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে প্রায় সব কৃষকের অবস্থাই এমন। সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই তার কোনো প্রতিফলন নেই। খলা থেকে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় ধান কিনে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। গত বছর এ সময় ধানের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু এবার একদিকে দুর্যোগ, অন্যদিকে দামের পতন, দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন তারা। উৎপাদন খরচ যেখানে মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, সেখানে ৭০০ টাকায় বিক্রি মানে মণপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান।
ইটনা উপজেলার কৃষক হুমায়ুন বলেন, "আমাদের চারপাশটা যেন এখন মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে তীব্র শ্রমিক সংকট, তার ওপর যারা আছেন তাদের মজুরি আকাশচুম্বী। ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই, কারণ জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনও নামানো সম্ভব হচ্ছে না। ধান তো কোনোমতে কাটছি, কিন্তু বাজারে সেই ধানের কোনো দাম নেই। পানির দরে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। এভাবে লোকসান গুনতে থাকলে আমরা সাধারণ কৃষকরা বাঁচব কীভাবে? পেটে ভাত না থাকলে তো আর টিকে থাকা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা এই কৃষি পেশা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।"
মিঠামইন এলাকার কৃষক হরিজন দাস বলেন, অনেক আশা আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঋণ করে নিজের সাত বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। ভেবেছিলাম ফসল ঘরে তুললে অভাব মিটবে, ধারের টাকা শোধ করব। কিন্তু কপাল মন্দ! ধান কাটার পর যখন খলায় আনলাম, তখন দেখি পাইকাররা প্রতি মণ ধানের দাম বলছে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। কেউ এই ভেজা ধান নিতেই চাইছে না। লোকমুখে শুনলাম সরকার নাকি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কিনবে, কিন্তু সেই খবরের কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। আর খবর পেলেই বা লাভ কী? অকাল বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ধানের রঙ নষ্ট হয়ে গেছে, তার ওপর ঠিকমতো শুকাতেও পারছি না। এমন ধান তো সরকারি গুদামে মানসম্মত হিসেবে গ্রহণ করবে না। এখন ঋণের টাকা শোধ করব কীভাবে, আর সংসারই বা চলবে কী করে?"
এদিকে গত রবিবার (৩ মে) থেকে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য মতে, এলএসডির মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে ও মূল্য ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
বর্তমানে কৃষিপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষকরা এক ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির ইচ্ছা থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং তথ্যের অভাবে সাধারণ কৃষকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি নিয়মানুযায়ী ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্দ্রতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু উপযুক্ত প্রযুক্তির অভাব এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক কৃষকই সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারছেন না। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফলানো ফসল নিয়ে গুদামে গেলেও শেষ পর্যন্ত তা ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে, যা কৃষকের আত্মবিশ্বাস ও পকেটে বড় ধরনের আঘাত দিচ্ছে।
সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম সম্পর্কে অনেক প্রান্তিক কৃষকই এখনো অন্ধকারে। মাঠপর্যায়ে যথাযথ প্রচারণা না থাকায় কৃষকরা জানেন না কখন বা কীভাবে তারা সরকারি সুবিধা নিতে পারবেন। ডিজিটাল নিবন্ধনের জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ কৃষকরা এই প্রক্রিয়ার চেয়ে খোলা বাজারে কম দামে ফসল বিক্রি করাকেই সহজ মনে করছেন।
কৃষকের কাছে ফসল ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত গুদাম বা সাইলো নেই। ফসল কাটার পরপরই সেটি সংরক্ষণ করতে না পারায় তারা দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা সীমাবদ্ধ হওয়ায় সব কৃষক সেখানে ধান দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি কৃষকের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে খোলা বাজারের দাম অনেক কম হওয়ায় কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন। সারের দাম, সেচ খরচ এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির পর যদি ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকরা কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাদেকুর রহমান বলেন, দেশের কৃষি অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, বরং মাঠপর্যায়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। অনেক সময় ধান কাটার মৌসুমে আবহাওয়া প্রতিকূল থাকে এবং কৃষকদের কাছে ধান শুকানোর পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। আর্দ্রতা বেশি থাকায় তারা সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন না। তাই ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে অস্থায়ী ধান শুকানোর ব্যবস্থা বা আধুনিক ড্রায়ার মেশিন স্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে কৃষকরা দ্রুত তাদের ফসল বিক্রির উপযোগী করতে পারেন। ধান কাটার সাথে সাথেই কৃষকের অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরকারি সংগ্রহ অভিযান দেরিতে শুরু হওয়ায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে দেয়। তাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সরাসরি কৃষকের বাড়ি বা স্থানীয় বাজার থেকে দ্রুত ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কৃষকের পরিবহন খরচ কমবে এবং তারা সরাসরি লাভবান হবেন।
কিশোরগঞ্জের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় থাকলে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে।‘কৃষকরা যাতে সহজে সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেন সেজন্য উপজেলায় উপজেলায় মাইকিংসহ সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৫ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ধান সংগ্রহ কার্যক্রম এগিয়ে ৩ মে থেকেই শুরু করা হয়েছে।’
পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধান গুদামে দিতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ ‘মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা যাতে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা মনিটরিং কমিটির সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, মাঠপর্যায়ের ৪ মে এর তালিকা অনুযায়ী জেলার মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১১ হাজার ১৭৪ হেক্টর। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৯ হাজার ৭১৫জন কৃষক। ক্ষতিকর পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকা। এর পরে আরও দেড় হাজার হেক্টর বোরোধান জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে।
কৃষকদের এই হাহাকার কেবল ফসলের ক্ষতি নয়, বরং আমাদের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। সঠিক তদারকি না হলে আগামীতে হাওরের কৃষি ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
কেকে/ এমএস