দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা যতই আশাবাদের কথা শোনান না কেন, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা এখন অত্যন্ত নির্মম। বাজারে গেলেই সেই কঠোর সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সবাইকে। ভরা ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফেরার দিন ফুরিয়ে আসছে; মানুষ এখন হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখছে, মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশের ঘর পেরিয়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকা কেবল একটি গাণিতিক পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হওয়ার ইঙ্গিত। এপ্রিলের মাঝামাঝি সরকার ডিজেল, কেরোসিনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বাড়িয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের অভিঘাত কাঁচাবাজারে আসতে সময় লাগেনি। আমরা জানি, জ্বালানির দাম বাড়লে তার বহুমুখী প্রভাব পড়ে পরিবহন ও উৎপাদন খাতে। পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া থেকে শুরু করে সেচের খরচ—সবই বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। চালের দাম স্থিতিশীল থাকার কথা বলা হলেও মাছ, মাংস, ডিম কিংবা সবজির বাজারে এখন হাত দেওয়ার উপায় নেই। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো এখন বাজারে গিয়ে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটে ভুগছে। খরচের তালিকায় কাটছাঁট করতে করতে তারা এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষের আয় এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বিবিএসের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, মজুরি বৃদ্ধির হার (৮ দশমিক ১৬ শতাংশ) মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এর অর্থ হলো, মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। মানুষ আগের মতোই কাজ করছে, কিন্তু মাস শেষে আগের চেয়ে কম খাবার, কম ওষুধ আর কম স্বস্তি নিয়ে ঘরে ফিরছে। জীবনযাত্রার এই ঘাটতি মেটাতে অনেক পরিবার শিক্ষা ও চিকিৎসার বাজেটে হাত দিচ্ছে। কেউবা পুষ্টিকর খাবারের বদলে সস্তা ও নিম্নমানের বিকল্প বেছে নিচ্ছে।
অনেকে আবার সংসার চালাতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতিকে কেবল বৈশ্বিক অস্থিরতা বা ডলার সংকটের দোহাই দিয়ে আড়াল করার সুযোগ নেই। দেশের ভেতরে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহব্যবস্থার অস্বচ্ছতা এবং তদারকির অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সরকার বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ালেও অভ্যন্তরীণ বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না।
আমরা মনে করি, বর্তমান সংকটকে কেবল সংখ্যার খেলায় সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখা উচিত। কেবল মুদ্রানীতি বা সুদের হার বাড়িয়ে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যদি না বাজার তদারকি জোরদার করা যায়। টিসিবির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে; এই দীর্ঘশ্বাস কমাতে হলে সরকারকে দ্রুত, সমন্বিত এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় জনজীবনে এই অস্থিরতা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেকে/এলএ