কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; কূটনীতি আবর্তিত হয় জাতীয় স্বার্থকে ঘিরে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতা সেই পুরোনো সত্যকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। একদিকে পারস্পরিক সহযোগিতার বার্তা, অন্যদিকে সীমান্ত, তিস্তা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা— সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন এক নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি।
গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একই বিমানে মরিশাস যাত্রার মধ্য দিয়ে যে ‘মধুময়’ সম্পর্কের আবহ তৈরি হয়েছিল, মে মাসের তপ্ত রোদে তা যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় বিজেপির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সক্রিয় অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা এই দুই নিকট প্রতিবেশীর চিরাচরিত সম্পর্কের সমীকরণকে এক জটিল গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে।
শুরুটা হয়েছিল আশার আলো দিয়ে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সম্পর্কের যে শৈত্যপ্রবাহ ছিল, বিশেষ করে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার পর ভারতের যে গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে গত কয়েক বছরে দুই দেশই অনেক দূর এগিয়েছিল। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের যে নতুন রূপরেখা অনেকে দেখতে পেয়েছিলেন, তাকে অনেকেই অভিহিত করেছিলেন ‘নতুন দিগন্ত’ হিসেবে।
খলিলুর রহমানের ভারত সফরের পর মনে হয়েছিল, দিল্লি ও ঢাকার দূরত্ব কাটিয়ে দুই পক্ষই এখন এক নৌকার যাত্রী। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেছিলেন, এ সম্পর্ক কোনো নতুন শুরু নয়; বরং দীর্ঘদিনের অভিন্ন নদী ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, তখন সাধারণ মানুষের মনে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু গত ৫ মে গণমাধ্যমে খলিলুর রহমানের সেই রণক্লান্ত সুর এবং ৭ মে দিল্লির পাল্টা কড়া জবাব প্রমাণ করে যে, সেই মধুর সম্পর্ক আসলে ছিল এক ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক কৌশল। এ উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের যে ঘোষণা এবং তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাংলাদেশের জন্য এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে তারা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য জমি বরাদ্দ করবে। এর অর্থ হলো, ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত এখন পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার জমি অধিগ্রহণে যে অনীহা দেখিয়ে আসছিল, বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সেই বাধা অপসারিত হয়েছে। ফলে বিএসএফ এখন সীমান্তের ৫০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত তাদের কার্যপরিধি বিস্তৃত করতে পারবে, যা বাংলাদেশের জন্য সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
বিজেপির ‘শনাক্ত করো, নির্মূল করো এবং বিতাড়িত করো’ (Detect, Delete and Deport) নীতিটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কম্পন সৃষ্টি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল যখন সাফ জানিয়ে দেন যে, অবৈধ নাগরিকদের ফেরত দেওয়াই ভারতের মূল নীতি এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা কাম্য, তখন পরিস্থিতি আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকে না।
জয়সওয়ালের বক্তব্যে ঝুলে থাকা ২ হাজার ৮৬০টি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মামলার প্রসঙ্গটি আসলে একটি প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা। ভারত এখন চাইছে দ্রুততম সময়ে তথাকথিত ‘অবৈধ’ ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তিনি বলেছেন, ভারত যদি ‘পুশ-ইন’ করার চেষ্টা করে, তবে বাংলাদেশও ‘পাল্টা ব্যবস্থা’ নেবে। এই ‘কড়া কথার জবাবে দ্বিগুণ কড়া’ সংস্কৃতি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সম্পর্কের ফাটলকেই নির্দেশ করে।
তবে এ সংকটের সবচেয়ে বড় ও স্পর্শকাতর ইস্যু হলো তিস্তা। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য এক দীর্ঘশ্বাস। ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় যে চুক্তি হওয়ার কথা ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা আজও আলোর মুখ দেখেনি। ভারত উজানে জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ব্যারেজের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ করায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশ মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছাড়ার ফলে বন্যা ও নদীভাঙন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যখন চীনের ১২ হাজার কোটি টাকার ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ (Teesta River Management and Restoration Project) নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে এগোতে শুরু করেছে, তখনই দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। তিস্তা যেহেতু ভারতের ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের সন্নিকটে, তাই সেখানে চীনের কারিগরি বিশেষজ্ঞ বা কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠাকে ভারত কখনোই সহজভাবে নেবে না।
২০২৪ সালের জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দিল্লি এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিল এবং সমীক্ষা করতে কারিগরি দল পাঠানোর কথা বলেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার যখন আবারও চীনের দিকে ঝুঁকছে, তখন দিল্লি এটিকে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান যখন বলেন, ‘তিস্তা নিয়ে ভারতের জন্য আর বসে থাকা যাবে না’, তখন তিনি আসলে ভারতের দীর্ঘসূত্রতার বিরুদ্ধে এক সাহসী অবস্থান ঘোষণা করেন। চীনের এই মহাপরিকল্পনায় রয়েছে নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং পর্যটন হাব তৈরির মতো বৈপ্লবিক সব পরিকল্পনা।
বাংলাদেশ যদি চীনের এই বিশাল ঋণের ফাঁদ এড়িয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা উত্তরবঙ্গের মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে ঠিকই, কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের রশিটিও আরও ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্যে তিস্তা নিয়ে কোনো নতুন সমাধান আসেনি; বরং তিনি ৫৪টি অভিন্ন নদীর নিয়মিত বৈঠকের গৎবাঁধা কথাই শুনিয়েছেন। এটি ঢাকার জন্য হতাশাজনক।
যখন একটি দেশ পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘ এক যুগ ধরে শুধু প্রতিশ্রুতিই পায়, তখন বিকল্প শক্তির দিকে হাত বাড়ানোটা কূটনৈতিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু ভূ-রাজনীতির নিয়ম হলো, কোনো দেশই তার প্রভাববলয়ে অন্য কোনো পরাশক্তির প্রবেশ সহজে মেনে নেয় না। ফলে ভারতের এই ‘পুশ-ইন’ বিতর্ক এবং সীমান্তের কড়াকড়ি আসলে তিস্তা প্রকল্পে চীনের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত চাপ হতে পারে বলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
আগামী ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণের পর সীমান্ত ও পুশ-ইন নিয়ে ভারত কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ। যদি ভারত সত্যিই বড় আকারের পুশ-ব্যাক শুরু করে, তবে তা কেবল কূটনৈতিক উত্তেজনা নয়, বরং বাংলাদেশে এক বড় ধরনের মানবিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে দুই দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদের জয়গান আরও প্রকট হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন আর কেবল ‘সোনালি অধ্যায়’ বা ‘মধুময়’ শব্দের মোড়কে আটকে নেই। এটি এখন কঠোর জাতীয়তাবাদ এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক জটিল রণাঙ্গন। বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন তিস্তার পানি জরুরি, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস না করার যে ঘোষণা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়েছে, তা রক্ষা করতে হলে ঢাকাকে অত্যন্ত সুচারু ও দূরদর্শী কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে।
দিল্লিকেও বুঝতে হবে যে, শুধু চাপ দিয়ে বা অভিন্ন সীমান্তের দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো জিইয়ে রাখা সম্ভব নয়। সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে তিস্তা সমস্যার সমাধানই হতে পারে এই উত্তেজনার একমাত্র প্রশমনকারী। অন্যথায়, তিস্তার জল আর সীমান্তের কাঁটাতার দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাসকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকেই ঠেলে দেবে।
আজকের পর শুরু হওয়া এই নতুন অধ্যায়টি দুই দেশের জন্য কোনো সুসংবাদ নিয়ে আসবে, নাকি উত্তেজনার বারুদ আরও উসকে দেবে— তা সময়ের কাছেই তোলা রইল।
লেখক : সাংবাদিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক