কক্সবাজারের রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের তুলাতলীর ঘোনাপাড়া এলাকার মেয়ে কুলসুমা। বাড়িতে টিবওয়েল না থাকার কারণে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে নদীর ওপার থেকে খাবার পানি আনতে হয়। সাজ্জাদ পড়ালেখা করে নাইক্ষ্যংছড়ি কলেজে। তারও প্রতিদিন এই সাঁকো পার হয়ে কলেজে যেতে হয়। অনেক সময় বর্ষা মৌসুমে পানি বেশি হলে এপার থেকে ওপারে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে কারণ সাঁকোটি তেমন মজবুত নয়। ঠিক এমন কাহিনী রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামে হাজারো মানুষের।
উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি—এমন একটি জনপদ কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন। যেখানে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে তুলাতুলি এলাকার ‘ঘোনার পাড়া’ (যা আব্দুস সালাম মেম্বারের ঘোনাপাড়া নামে পরিচিত) গ্রামের হাজারো মানুষ আজও যাতায়াত করেন আদিম কায়দায়। একটি টেকসই ব্রিজ ও পাকা রাস্তার অভাবে গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা এখন নড়বড়ে একটি বাঁশের সাঁকো।
প্রতিদিন শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে খাল পার হচ্ছেন। খালের দুই পাশের রাস্তাটি কাঁচা ও ভাঙাচোরা হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। বিশেষ করে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের জন্য এই পারাপার এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই সাঁকোটি এখন আর যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এলাকাবাসীর চোখের জলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রামের যাতায়াত ব্যবস্থা সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এলাকার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এই নড়বড়ে সাঁকো পার হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। বর্ষাকালে সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় অনেক সময় শিক্ষার্থীরা খালে পড়ে গিয়ে বই-খাতা ভিজিয়ে ফেলে। দুর্ঘটনার ভয়ে অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে সাহস পান না।
এলাকায় কোনো বড় চিকিৎসা সংকট দেখা দিলে বা কোনো গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে হলে চরম বিপাকে পড়তে হয়। অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য কোনো যানবাহন গ্রামে প্রবেশের কোনো ব্যবস্থা নেই; যার কারণে অনেকটা জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর আর কেউ এই অবহেলিত জনপদের খোঁজ নেন না। স্বাধীনতার পর থেকে এখানে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়নি।
এলাকাবাসী জানান, আমরা কি বাংলাদেশের নাগরিক নই? সব জায়গায় ব্রিজ-কালভার্ট হয়, অথচ আমাদের একটি ব্রিজের জন্য দশকের পর দশক অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আমাদের কষ্টের কি কোনো শেষ নেই?
স্থানীয় যুবক হারুন জানান, এই একটি ব্রীজের কারণে আমরা অন্যান্য গ্রাম থেকে ৫০ বছর পেছনে আছি। এলাকায় কোন ধরনের গাড়ি আসতে পারে না। সড়ক ব্যবস্থা ভাল নেই। আমাদের পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে কষ্ট হয়ে পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা পিছিয়ে আছে যাতায়াতের কারণে। এই সাঁকো জায়গায় একটি ব্রীজ করা হয় হাজারো মানুষের যাতায়াত যেমন সহজ হবে তেমনি মানুষের আর্থিক উন্নয়নও হবে।
বর্তমানে বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় তুলাতুলি ও ঘোনার পাড়ার মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি—দ্রুত এই খালে একটি স্থায়ী ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণ এবং চলাচলের জন্য রাস্তাটি পাকাকরণ করা হোক।
কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু নোমান মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘এই সাঁকোর কারণে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বিষয়টি দেখবেন।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী বলেন, ‘আমি বদলি হয়ে গেছি, পরবর্তী যিনি আসবেন তাকে বিষয়টা জানিয়ে যাব। আশা করছি, উপজেলা প্রশাসন এ দায়িত্ব পালন করবে।’
কেকে/এমএ