কারা অধিদপ্তরকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ‘বিশেষ চক্র’। গোপনে তাদের সহযোগিতা করছে ফেসবুক গ্রুপ ও আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে একজন অ্যাডিশনাল ডিআইজি, তিনজন সিনিয়র জেল সুপার, চারজন জেল সুপার ও চারজন জেলার সরাসরি জড়িত। নানা কারণে এরা সবাই কারা অধিদপ্তরে অতিমাত্রায় বিতর্কিত। তাদের হয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত হন কয়েকজন ডেপুটি জেলার, সর্বপ্রধান কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী ও সহকারী প্রধান কারারক্ষী। সূত্র মতে, অবসরপ্রাপ্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত।
সূত্র জানায়, কারা অধিদপ্তরে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত বিশেষ চক্রের সদস্যদের শনাক্তে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন পাওয়ার পরই চক্রের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে শনিবার নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। এদিকে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বিশেষ চক্রটির বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে চক্রের কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিছুদিন ঘাপটি মেরে থাকা চক্রটি নতুন করে আবারও মরিয়া হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, কারাগারে ঘুষ লেনদেন, যে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন আইজি প্রিজন্স। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অপরাধ এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত কেউ ছাড় পাবেন না। শনিবার রাতে তিনি দৈনিক খোলা কাগজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সূত্র মতে, হসপিটালাইজড প্রিজনার্স সিকিউরিটি ইউনিটসহ ৭৩ কারাগারে ফিরেছে স্বচ্ছতা। যে কোনো সময়ের তুলনায় বন্দিরা এখন অনেক ভালো রয়েছেন। পরিবর্তন আনা হয়েছে খাবারের মেন্যুতে। পরিবেশন করা হয় রুচিসম্মত খাবার। শনিবার রাতের হিসেব অনুযায়ী ৭৩ কারাগারে ৮২ হাজার ৮৫৪ জন বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ৭৯ হাজার ৫৮০ জন পুরুষ ও ৩ হাজার ২৭৪ জন নারী।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি কারা অধিদপ্তরে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলেছেন সামরিক ও বেসামরিক বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন কারাগারে ডিউটি সংকট সৃষ্টি হওয়ায় আইজি প্রিজন্স সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমতি নিয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আদেশ প্রত্যাহার করে কাজে যোগদান করান। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আরেক দফা প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার হওয়াদের তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের বিভাগীয় মামলা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি হবে। ডিউটি সংকট কাটাতে আপাতত তাদের চাকরিতে বহাল করা হয়েছে। আইজি প্রিজন্স বলেন, তাদের পেছনে বেতন ও ভাতাসহ সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ হচ্ছিল।
জানা যায়, গত এক বছর আট মাসে কারা অধিদপ্তরের দীর্ঘ দেড় যুগের নানা জঞ্জাল মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। সব সম্ভব হয়েছে আইজি প্রিজন্সের কর্মদক্ষতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও কঠোরতার জন্য। ঢেলে সাজানো হয়েছে ৭৩ কারাগার। কমে গেছে অপরাধ। সুফল ভোগ করছেন বন্দি ও তাদের পরিবার। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন এনডিসি, পিএসসি ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট কারা অধিদপ্তরে যোগ দেন। মেটাতে থাকেন দীর্ঘ দেড় যুগের জঞ্জাল।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নথি পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। জটিলতা নিরসন করে শতাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতির ব্যবস্থা করেন। পদোন্নতি দেওয়া হয় ছয় শতাধিক কর্মচারীকে। শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ড, অসদাচরণ ও দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা করায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নানা অপরাধে জড়িত থাকায় ২৫ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
অপরদিকে কারাগারে মোবাইল সেট ও মাদক সরবরাহ ঠেকাতে দেওয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশনা। নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা। কারা অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজানো হলেও মোবাইল সেট ও মাদক সরবরাহে সক্রিয় একাধিক চক্র। অতিরিক্ত টাকার নেশায় চক্রের সদস্যরা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত দেড় বছরে বিভিন্ন কারাগার থেকে দুই শতাধিক কারারক্ষীকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সাময়িক বরখাস্তের পর নেওয়া হয় বিভাগীয় ব্যবস্থা।
আইজি প্রিজন্স বলেন, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে হাই ফ্রিকোয়েন্সির মোবাইল জ্যামার বসানো হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে জ্যামারগুলো চালু হওয়ায় অপরাধীরা এখন মোবাইল চালাতে পারছে না। এরই মধ্যে কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারে হাই ফ্রিকোয়েন্সির মোবাইল জ্যামার বসানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য কারাগারে হাই ফ্রিকোয়েন্সির মোবাইল জ্যামার বসানো হবে। এতে কারাভ্যন্তরে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।
অন্যদিকে গত দেড় বছরে কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশনসহ নানা সুবিধা বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে আনা হয় প্রাণচাঞ্চল্য। বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে বন্দি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থায়। নেওয়া হয়েছে উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প। বাড়ানো হয়েছে বন্দিদের মোবাইল কলের সুবিধা। কারা অধিদপ্তরে চালু করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় কল সেন্টার। বন্দিদের আত্মীয়-স্বজন যে কোনো তথ্য জানতে পারেন।
কেকে/এলএ