রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      রাষ্ট্রপতির শপথ-দায়িত্বভার গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি      নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা      রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ মির্জা ফখরুলের      প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হলেন রশিদুজ্জামান মিল্লাত      কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন শপথ নেওয়া ছয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিজনের নীড় হোক প্রতিটা মায়ের শেষ আশ্রয়!
মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক খলিল জিবরান বলেছেন আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর শব্দ হলো ‘মা’। পৃথিবীতে একজন সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম নিরাপত্তার নাম হলো মা! মা-ছোট্ট একটি শব্দ অথচ এই শব্দটিই আঁকড়ে ধরে থাকে একজন সন্তানের সারা জীবন ঘিরে। একজন সন্তানের প্রথম সাহস তার মা। 

মাকে ঘিরেই একটি ছোট্ট শিশু গড়ে তোলে তার সমস্ত পৃথিবী। ছোটবেলা হাতেখড়ি থেকে শুরু করে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূহূর্তে সন্তানের পাশে ছায়ার মতো থাকে তার মা। মায়ের মতো প্রশান্তি যেন পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব হয় না মায়েদের ঋণ। একজন সন্তানের প্রতিটি মুহূর্ত যেন তার মায়েরই অবদান। 

‘মা’ শব্দটি ছোট হলেও এর গভীরতা বিশাল। সন্তানের সুখ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য একজন মা নিজের জীবনের সবটুকু ত্যাগ করতেও দ্বিধা করেন না। আর তাই ইংরেজ কবি ও ঔপন্যাসিক রুডইয়ার্ড কিপলিং বলেছেন, ঈশ্বর সব জায়গায় থাকতে পারেন না বলেই তিনি মাকে সৃষ্টি করেছেন। 

ফরাসী কবি ভিক্টোর হুগো বলেছেন, মায়ের বাহুর চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ম্যাক্সিম গোর্কির বিখ্যাত ‘মা’ গ্রন্থে তিনি উল্ল্যেখ করেছেন মায়ের হৃদয় সন্তানের প্রথম আশ্রয়।

অথচ সময়ের নির্মম পরিহাসে সেই মাকেই জীবনের শেষ সময়ে অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আশ্রয় নিতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। এটি শুধু একটি পারিবারিক সংকট নয়। বরং আমাদের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও পারিবারিক দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একসময় যৌথ পরিবারে মা-বাবারা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও উপস্থিতি ছিল পরিবারের শক্তি। কিন্তু আধুনিকতা, নগরায়ণ, ভোগবাদী মানসিকতা ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনের কারণে সেই পারিবারিক কাঠামো দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। ব্যস্ততার অজুহাতে কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্বে অনেক সন্তান আজ বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলস্বরূপ, জীবনের প্রয়াণকালে অনেক মায়ের ঠাঁই হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।

বৃদ্ধাশ্রম হয়তো খাদ্য, চিকিৎসা বা থাকার ব্যবস্থা দিতে পারে কিন্তু কখনও সন্তানের ভালোবাসা, পরিবারের উষ্ণতা কিংবা আপনজনের সান্নিধ্যের বিকল্প হতে পারে না। একজন মা বৃদ্ধ বয়সে সবচেয়ে বেশি যা প্রত্যাশা করেন, তা হলো সন্তানের স্নেহ, সম্মান ও পরিবার পরিজনের পাশে থাকার নিশ্চয়তা। জীবনের পুরোটা সময় যিনি সন্তানকে আগলে রেখেছেন। তাঁর শেষ বয়সে নিঃসঙ্গতা ও অবহেলা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

অবশ্য বাস্তবতার নিরিখে এটিও সত্য যে, সব বৃদ্ধাশ্রম নেতিবাচক কারণে গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রেই নিঃসন্তান, অসুস্থ কিংবা একাকী বৃদ্ধ মানুষের জন্য এগুলো প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক মা-বাবাকে পরিবারে জায়গা না দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো হচ্ছে কেবলমাত্র দায়িত্ব এড়ানোর মানসিকতা থেকে। এটি মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ধর্মে মায়ের মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে, জান্নাতকে মায়ের পায়ের নিচে বলা হয়েছে। শুধু ধর্ম নয়, পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও যত্নকে সর্বোচ্চ মানবিক গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই বৃদ্ধ বয়সে মায়ের প্রতি অবহেলা শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিক অবক্ষয়ও বটে। যা একটি সভ্য ও আদর্শ সমাজের জন্য অশনিসংকেত। 

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবারে ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক সফলতা নয়, মানুষ হিসেবে দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার শিক্ষাও জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

রাষ্ট্রীয়ভাবেও প্রবীণদের সুরক্ষা ও কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনগত সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। " মা " দিবস পালন ঘিরে একটি শিশুকে বড় করতে মায়েদের অবদান, মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব- কর্তব্য নানা মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানসিকতার পরিবর্তন। মনে রাখতে হবে, আজ যাঁরা বৃদ্ধ, একদিন তাঁরাও আমাদের জন্য নিজেদের যৌবন উৎসর্গ করেছেন। আর ভবিষ্যতে আমাদেরও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

বিশ্ব মা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল ফুল দেওয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সম্মান তখনই দেখানো হবে, যখন প্রতিটি মা তাঁর জীবনের শেষ সময়ে সন্তানের ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপদ আশ্রয় পাবেন।

বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক প্রতিটি মায়ের শেষ আশ্রয়, এ প্রত্যাশাই হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার। মা মানে সম্মান। এই পৃথিবীর প্রতিটি মা ভালো থাকুক, বেঁচে থাকুক হাজার বছর, আগলে রাখুক নিজ সন্তানকে। মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা ফুটে উঠুক প্রতিটি মুহূর্তে। মায়ের ভালোবাসা ছড়িয়ে যাক প্রতিটি সন্তানের মাঝে। মায়ের প্রতি অটুট থাকুক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। পৃথিবীর প্রতিটি "মা" কে জানাই আন্তর্জাতিক মা দিবসে শুভেচ্ছা।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close