সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা, আর মুসলমানদের এ পবিত্র উৎসবকে সামনে রেখে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত। সীমান্তের একের পর এক দুর্গম পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিনই বাংলাদেশে ঢুকছে বার্মিজ ইয়াবা, আইস ও গবাদিপশুসহ নানা দ্রব্যাদি।
একইসঙ্গে বাংলাদেশ থেকেও মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সার, ভোজ্যতেল, ওষুধ, ডিম, খাদ্যপণ্য, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, কসমেটিকস ও গাড়ির যন্ত্রাংশসহ শতাধিক ধরনের মালামাল।
বাংলাদেশ ও ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিশাল অংশজুড়ে চোরাচালান হয়। চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয় ভৌগোলিকভাবে দুর্গম স্থান, পাহাড়ি এলাকা ও নদীপথ।
বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে সিলেট, কুড়িগ্রাম, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, শেরপুর, পার্বত্য এলাকাসহ বিভিন্ন স্থান দিয়ে চোরাচালান হয়। বর্তমানে সীমান্তের ৭৯ শতাংশ অংশে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে আর বেড়াবিহীন রয়ে গেছে প্রায় ২১ শতাংশ দুর্গম ভূখণ্ড। সাধারণত বেড়াবিহীন এই এলাকা দিয়েই চোরাচালান হয়। দুর্গম বলেই চোরাচালানিরা এসব এলাকাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে।
নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, এ অশুভ বাণিজ্যের সঙ্গে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সংশ্লিষ্টতা। কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় সীমান্ত যেভাবে ‘খোলা করিডরে’ পরিণত হয়েছে, তাতে শুধু পণ্য নয়, বরং অপরাধী ও অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশও সহজ হয়ে পড়ছে।
বিজিবির ওপর সংঘবদ্ধ হামলার স্পর্ধা এটাই প্রমাণ করে যে, এই চক্রগুলো কতটা বেপরোয়া। আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সীমান্তে এই অপরাধের মাত্রা আরও কয়েক গুণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি রোধে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
যেসব পয়েন্টে বা খালের পাড়ে কোনো প্রতিরক্ষা প্রাচীর নেই, সেখানে দ্রুততম সময়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়াতে হবে। শুধু অভিযান নয়, বরং সীমান্তের ওপারে ও এপারে সক্রিয় ৫ শতাধিক চোরাকারবারির যে বিশাল সিন্ডিকেট, তাদের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে হবে।
বিশেষ করে যারা লোকাল ফার্মেসি বা বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও নিত্যপণ্য সরবরাহের সঙ্গে জড়িত, তাদের উৎসমুখ বন্ধ করতে হবে। দুর্গম পাহাড়ি পথে টহল দেওয়া অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ। এ অঞ্চলে বিজিবির বিওপি বা পোস্টের সংখ্যা বাড়ানো এবং ড্রোনসহ আধুনিক নজরদারি সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিজিবির ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত মিজান, আশরাফুল ও জহিরের মতো ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কোনো ছত্রছায়া যেন এদের বাঁচাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্ত এলাকার মানুষকে অপরাধের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং তাদের সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ বলয়’ গড়ে তুলতে হবে।
সীমান্ত সুরক্ষা কেবল একটি বাহিনীর দায়িত্ব নয়, এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। আমরা আশা করি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবি এই ‘স্বর্গরাজ্য’ গুঁড়িয়ে দিতে আরও কঠোর ও আপসহীন হবে। পবিত্র ঈদের আনন্দ যেন চোরাকারবারিদের অবৈধ কারবারে ম্লান না হয়, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
কেকে/ এমএস