বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আবারও প্রাণ ঝরেছে। কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর ফের উত্তেজনা ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই আগ্রাসী আচরণ শুরু করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথের কয়েক ঘণ্টা আগে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
পাশাপাশি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইন করা হয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা যেন ধীরে ধীরে আমাদের জাতীয় জীবনের এক নির্মম স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে। কদিন পরপরই একই ধরনের খবর আসে, কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর আবার নীরবতা। কিন্তু আমার মতো লাখো সচেতন মানুষের এ প্রশ্নটি থেকেই যায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবন কি এতটাই সস্তা যে সীমান্তে তাদের মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে?
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্ত ঘিরে দুই দেশের রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই সম্পর্কের ওপর সবচেয়ে বড় কালিমার নাম ‘সীমান্ত হত্যা’।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, গত দুই দশকে শত শত বাংলাদেশি সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন। কখনো তারা কৃষক, কখনো শ্রমজীবী মানুষ, কখনো কিশোর, আবার কখনো শুধুই সীমান্তবর্তী গ্রামের সাধারণ বাসিন্দা। আর এই বিএসএফ সীমান্তে কী ধরনের বর্বরতা চালায়, সেটার চিত্র পাওয়া গেছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত ১১ বছরের বার্ষিক সীমান্ত সংঘাতের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো ঘেঁটে।
আসকের হিসাব অনুযায়ী গত ১১ বছরে (২০১৪-২৪) বাংলাদেশের সীমান্তগুলোয় শুধু বিএসএফের গুলিতেই প্রাণ হারিয়েছে ২৮৯ বাংলাদেশি। সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে এর একমাত্র ও অদ্বিতীয় উদাহরণ হলো আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্র আর মেক্সিকোর সীমান্ত। বাংলাদেশ-ভারত আর যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশের সীমান্তে এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় না।
এ ছাড়া সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী সাত বছরে (২০১৮-২৪) বিএসএফ পিটিয়ে হত্যা করেছে ২৮ বাংলাদেশিকে। সেইসঙ্গে নানা কারণে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের ধাওয়ায় প্রাণপণ ছুটতে গিয়ে চার বছরে (২০২১-২৪) প্রাণ হারিয়েছে ছয়জন।
আসকের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে বিগত ১১ বছরে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে ধান কাটা, গরু চরানো, মাছ মারা ও গৃহস্থালির কাজ করা অবস্থায় ৩১৯ বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধরে নিয়ে যাওয়া এই নাগরিকদের ভাগ্যে কী ঘটে, তা জানা যায় না। ধরে নিয়ে যাওয়া এই নাগরিকদের কতজন ফিরে আসেন, সেটাও থেকে যায় অজানা।
তবে আসকের গত চার (২০২১-২৪) বছরের হিসাব অনুযায়ী, ধরে নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ফেরত এসেছেন মাত্র সাতজন। এ চার বছরে বিএসএফ বাংলাদেশ থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ১৭ নাগরিককে। যাদের ১০ জনই ফিরে আসার খবর পাওয়া যায়নি।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বহুবার বলা হয়েছে, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কমানো হবে। ‘নন-লেথাল ওয়েপন’ ব্যবহারের আশ্বাসও এসেছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে। বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকগুলোতেও সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রতিশ্রুতি থাকে কাগজে, আর রক্ত ঝরে সীমান্তের মাটিতে।
প্রায়শই বিএসএফের পক্ষ থেকে আত্মরক্ষা, অনুপ্রবেশ কিংবা চোরাচালান প্রতিরোধের যুক্তি তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোনো নিরস্ত্র ব্যক্তি, কৃষক বা সন্দেহভাজন চোরাকারবারির বিরুদ্ধে সরাসরি গুলি চালানো কতটা ন্যায়সঙ্গত?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধের বিচার আদালতে হয়, সীমান্তে তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড দিয়ে নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জাতিসংঘের নীতিমালাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজনীয়তা’ ও ‘সমতা’র নীতি অনুসরণের কথা বলে। সেখানে ‘ঝযড়ড়ঃ ড়হ ঝরমযঃ’ ধরনের সংস্কৃতি কোনোভাবেই সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ হতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এ ঘটনাগুলোর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ, পতাকা বৈঠক কিংবা কূটনৈতিক উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই। অথচ সীমান্তে যখন একের পর এক লাশ পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে আরও দৃশ্যমান, আরও দৃঢ় অবস্থানের। কারণ রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্বই হলো তার নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নিশ্চয়ই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ট্রানজিট ও কৌশলগত স্বার্থের জটিল সমীকরণ। কূটনৈতিক বাস্তবতা কখনোই উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু সেই বাস্তবতা এমন হতে পারে না, যেখানে সীমান্তে নাগরিকের প্রাণহানি বারবার ঘটবে আর রাষ্ট্র শুধু ‘উদ্বেগ’ জানিয়েই দায়িত্ব শেষ করবে। বন্ধুত্ব যদি সত্যিই পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার প্রথম প্রতিফলন ঘটতে হবে সীমান্তে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আরও কার্যকর ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, সীমান্ত হত্যার প্রশ্নটিকে শুধু বিজিবি-বিএসএফ পর্যায়ের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিষয়টি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়মিতভাবে উত্থাপন করতে হবে। প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ ও যৌথ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য স্পষ্ট কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামগুলোতে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় হতে হবে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে সীমান্ত হত্যা ইস্যুকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা জরুরি। কারণ এটি শুধু দুই দেশের সীমান্ত সমস্যা নয়; এটি মানবিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক আইনেরও প্রশ্ন।
তৃতীয়ত, সীমান্তবর্তী এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট অনেক মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে ঠেলে দেয়। সীমান্ত অঞ্চলে শিল্প, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও বিকল্প অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারলে অবৈধ পারাপার ও চোরাচালানের প্রবণতাও কমে আসবে।
চতুর্থত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। আধুনিক মনিটরিং, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা এবং কার্যকর টহলের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে সীমান্ত অতিক্রম বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
সীমান্তে প্রতিটি প্রাণহানি কেবল একটি মৃত্যুই নয়; এটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, মানবাধিকার এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ওপরও আঘাত। কাঁটাতারের পাশে যদি বারবার রক্ত ঝরে, তবে বন্ধুত্বের ভাষণ সাধারণ মানুষের কাছে ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি পরীক্ষিত হবে তখনই, যখন সীমান্তে আর কোনো মায়ের সন্তান লাশ হয়ে ফিরবে না। এখন সময় এসেছে বাংলাদেশ যেন তার নাগরিকের জীবনের প্রশ্নে আরও দৃশ্যমান, দৃঢ় এবং কার্যকর অবস্থান গ্রহণ করে।
লেখক : নির্বাহী সদস্য, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদ, রাকসু
কেকে/ এমএস