সুদূর অস্ট্রেলিয়ার একজন অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার সুবাদে প্রতিনিয়ত আমাকে আধুনিক বিশ্বের দ্রুততম প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে এ কাজ করতে হয়। ল্যাবরেটরির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং এবং জটিল অ্যালগরিদম নিয়ে আমার দিন কাটলেও, আমার হৃদস্পন্দন সব সময় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামের সেই উর্বর পলিমাটির বদ্বীপের উন্নয়নের চিন্তা নিয়ে।
পৃথিবীর অন্যান্য জাতির যখন প্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে আমরা কীভাবে তাদের সঙ্গে তাল মিলাতে পারি এবং সমৃদ্ধি আনতে পারি। আমার মনে হয় যে মাটি আমাকে বড় করেছে এবং যার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি যদি আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর হয় তাহলে আমরাও পারি সমৃদ্ধ একটি জাতি হিসেবে নিজেদের পৃথিবীর বুকে তুলে ধরতে।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ব্লকচেইন এবং আধুনিক শাসনকাঠামো নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গবেষণা ও এসব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। সারা পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষ যখন তাদের প্রযুক্তির উচ্চশিক্ষা নিয়ে ফিরে গিয়ে তাদের দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জোরালো ভূমিকা রাখছে, তখন আমার ভাবনায় আসে আমার দেশের কথা।
একুশ শতকের বিস্ময়কর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে কাজ করা অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং আমার গভীর চিন্তার বিষয়ও এগুলো। আমার চিন্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে আমি লিখছি। ধারাবাহিকভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ধারণাগুলো কীভাবে আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বদলে দিতে পারে বা জনগণের কল্যাণে আরও ভালোভাবে সরকার কাজ করতে পারে তা নিয়ে আমার গবেষণালব্ধ বিভিন্ন বিষয় খণ্ড খণ্ড নিবন্ধের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারযোগ্য তৈরি, গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্ভুলতা পরীক্ষা করার পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজের বাইরে গিয়ে আজ এ সময়ের বাস্তবতায় বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারা এবং খণ্ডিত ভাবনাগুলোকে একটি সমন্বিত এবং আধুনিক রূপরেখায় নিয়ে আসার কথা আমি এ প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ করছি। সদ্য গঠিত নতুন সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্দেশনা দেওয়ার জায়গা থেকে আজকের এ নিবন্ধে একটি নতুন আইসিটি সিস্টেম উন্নয়নের রূপকল্প হিসেবে দেখা যেতে পারে। স্বচ্ছ রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্য সামনে রেখে যার নাম আমি ‘তথ্য-চালিত অ্যাগ্রিগেটেড ইনোভেশন সিস্টেম’ হিসেবে অভিহিত করছি।
আমার প্রস্তাবিত এ ‘অ্যাগ্রিগেটেড ইনোভেশন সিস্টেম’ কোনো অলীক কল্পনা বা নিছক স্বপ্ন নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং বাস্তবায়নযোগ্য আইসিটি ব্যবস্থাপনার রোডম্যাপ যা আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে বিশ্বের বুকে একটি আধুনিক, স্বনির্ভর এবং উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সক্ষমতা রাখে। এ পরিকল্পনার মূলে রয়েছে প্রচলিত পদ্ধতিগত দুর্নীতি দূর করে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ এবং জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এখানে প্রযুক্তিকে শুধু একটি যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়নি, বরং একে মানুষের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং নিজস্ব স্বকীয়তার ওপর ভিত্তি করে সঠিক ও সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ করবে। যার প্রধান সহায়ক শক্তি বা হিউম্যান-সেন্ট্রিক টুল হিসেবে আমাদের এই ব্যবস্থাপনার রূপকল্পটি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ রূপকল্পের মাধ্যমে আমরা দেশকে এমন একটি ‘এআই পাওয়ার্ড স্টেট’ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তথ্যের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষিত থাকবে।
যার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সেবা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকনিকাল সাপোর্ট এবং ইন্টেলিজেন্ট লার্নিং নিশ্চিন্তে গ্রহণ করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের যে কোনো ছোট বা মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইবিএম থেকে যে কোনো সময় প্রয়োজনীয় এআই ট্রেনিং বা যন্ত্রপাতি নিতে পারবে, তার ছোট্ট ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক মানে করার জন্য।
এ রূপকল্পটি মূলত শহীদ জিয়ার স্বনির্ভরতার আদর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৩১-দফার আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র উপহার দেওয়ার কৌশলগত স্তম্ভ হিসেবে দেখা যেতে পারে। যা হোক, অস্ট্রেলিয়ার উন্নত শহরের প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো যখন আমি দেখি, তখন আমার অবচেতনেই মনে হয় যে আমার দেশের প্রতিটি শহর বা গ্রাম কেন এমন আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ছোঁয়া পেতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রায় ৬০-৬৮% নারী যারা গ্রামে বসবাস করেন এবং প্রায় ৩৩ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের গড় বয়স মাত্র ২৭.৬ বছর, তাদের সৃজনশীলতাকে যদি আমরা এজেন্টিক এআই বা ব্লকচেইন গভর্ন্যান্সের মতো প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষতার সঙ্গে সমন্বিত করতে পারি, তবে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই একটি সমৃদ্ধ এবং যুগোপযোগী মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে। আমাদের এ রূপকল্পটি সরাসরি নারী ক্ষমতায়নে এবং তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
আইসিটির এ রূপকল্পের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে এমন এক পরিবর্তনের কথা বলছি যেখানে আমরা আমাদের নিজস্ব সিস্টেমস নিজেরাই তৈরি করব। আর এ রূপান্তরের মাধ্যমেই আমরা বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তৈরি সিস্টেমস, যেমন এগ্রি-টেক এবং এআই সলিউশন রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারব। যা কিনা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের অবস্থানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে। আমার এবং আমার মতো বহির্বিশ্বে অবস্থানকারী অনেক মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানের নির্যাস থেকে তৈরি এই প্রস্তাবিত রূপকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু আধুনিক হবে না, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে উদ্ভাবনের দিকপাল হিসেবে নেতৃত্ব দেবে।
বাংলাদেশের শাসনকাঠামো পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ হিসেবে আমি ‘এআই পাওয়ার্ড স্টেট’ যার মাধ্যমে আমরা সরকারের ব্যবস্থাপনায় কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার পূর্ণ ব্যবহার ও ডেটা-চালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলছি। তথ্য সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে নিজস্ব হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার এবং এআই পরিচালিত জাতীয় ক্লাউড-গ্রিড তৈরি করা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বিষয়। কারণ জাতীয় তথ্য বিদেশি পাবলিক ক্লাউডে রাখা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের দেশের জন্য। আমাদের রূপকল্পটি পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত যা একটি আধুনিক ও বুদ্ধিমান রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের কাজ করতে সাহায্য করবে।
স্তম্ভগুলো হলো : সার্বভৌম এআই, জাতীয় ক্লাউড অবকাঠামো, সাইবার কমান্ড, ব্লকচেইন ভিত্তিক শাসন এবং মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব। আমাদের প্রস্তাবিত এই রূপকল্পটির পেছনে থাকবে একটি মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের পুল। এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশেষজ্ঞ গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সরাসরি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাডভাইসারি ক্যাপিটাল তৈরি করবে। যা দেশের কল্যাণে এবং দেশের মানুষের কল্যাণে সরকারের শক্তিশালী এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হবে আমি বলে বিশ্বাস করি।
বর্তমান যুগে সাইবার যুদ্ধের ময়দান ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে ডিজিটাল পরিকাঠামোয় বিস্তৃত হয়েছে। তাই আমাদের তথ্যের প্রতিটি স্তরে জিরো-ট্রাস্ট নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করতে হবে। এ নিরাপত্তা ডকট্রিনের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরে বা বাইরে কোনো ট্রাফিক বা অনুরোধকেই যাচাই ছাড়া প্রশ্নহীনভাবে নিরাপদ ভাবা হবে না।
আমাদের এই রূপকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেন এবং ডেটা ইন মোশন বা চলমান তথ্যকে একটি কেন্দ্রীয় সার্বভৌম মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে যাতে অননুমোদিত ব্যবহারের কোনো সুযোগ না থাকে। আমাদের এ রূপকল্পটি একটি প্রকৃত স্বচ্ছ ও জনবান্ধব প্রশাসনের কথা বলছে যা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ব্ল্যাক বক্স বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অস্পষ্টতা কাটিয়ে গ্লাস বক্স গভর্ন্যান্স (সরকারের সর্বকাজের স্বচ্ছতা) মডেলে যাচ্ছে।
যাহোক, এই মডেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে, যেমন কোনো টেন্ডার বাতিল, ঋণের আবেদন প্রত্যাখ্যান বা লাইসেন্স অনুমোদন, তখন কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক ব্যাখ্যা ও একটি নিখুঁত ডিজিটাল অডিট ট্রেইল সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি কর্মকর্তারা যে কোনো সময় যাচাই করে দেখতে পারবেন ঠিক কোন নিয়মের ভিত্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজ করেছে, যা প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। গ্লাস বক্স গভর্নেন্স পদ্ধতির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে সরকারি তহবিলের অপব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রিডিক্টিভ অডিটিং-এর পথ প্রশস্ত করবে।
আরও গভীরভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে, এজেন্টিক এআই-এর এই সমন্বিত প্রয়োগ সরকারি দপ্তরের ফাইলের স্তূপ কমাতে এবং প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপকে স্বচ্ছ ও ফলাফলমুখী করতে সক্ষম হবে। এভাবে তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে আমরা একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারব, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে এবং রাষ্ট্রের প্রসারে সবচেয়ে মানবিক ও স্বচ্ছ উপায়ে কাজ করবে।
কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন, যার পূর্ণ সম্ভাবনা আমাদের সামনে। কারণ আমাদের কাছে উপযুক্ত তথ্যের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুমান করার মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির জায়গা রয়েছে। তাই এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, আমাদের এই রূপকল্পটি বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে। আমার এইখানে এমন একটি রি-মডেলিং -এর কথা বলছি যে প্রক্রিয়ায় মাঠ পর্যায়ে ড্রোন এবং আইওটি সেন্সরের ব্যবহার ফসলের রোগবালাই শনাক্তকরণ ও মাটির আর্দ্রতা পরিমাপে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকরা কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আয় দ্বিগুণ করতে পারে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে একটি শস্য ভাণ্ডারের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করবে এমন একটি আঞ্চলিক ডেটা হাব স্থাপন করা প্রয়োজন যা উত্তরবঙ্গের মাটির জিনোম ডেটা বিশ্লেষণ করে নির্ভুল চাষাবাদ বা প্রিসিশন ফার্মিং নিশ্চিত করবে। একইভাবে দক্ষিণাঞ্চলীয় ডেটা ব্যাংক সমুদ্র অর্থনীতি এবং উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ফোকাস করবে, যা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ ও রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করবে । সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত কোল্ড স্টোরেজ এবং চাহিদাপত্র পূর্বাভাস ব্যবস্থা বা ডিমান্ড ফোরকাস্টিং ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা ফসলপরবর্তী অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পারি।
বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে এবং একে বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি ফলাফলমুখী করতে আমাদের এখনই এজেন্টিক এআই ফ্রেমওয়ার্ক গ্রহণ করার পথে হাঁটতে হবে। এই প্রযুক্তিটি শুধু তথ্য প্রদানকারী বা নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা কোনো সাধারণ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একজন সক্রিয় এবং স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল সহকর্মী হিসেবে কাজ করার সক্ষমতা রাখে। প্রথাগত জেনারেটিভ এআই, যেমন চ্যাটজিপিটি, মূলত রিয়্যাক্টিভ বা প্রতিক্রিয়ামূলক, এটি ব্যবহারের জন্য মানুষের অনবরত প্রম্পট বা নির্দেশের প্রয়োজন হয় এবং একটি কাজ শেষ করার পর এটি পরবর্তী নির্দেশনার জন্য নিষ্ক্রিয়ভাবে অপেক্ষা করে।
এর বিপরীতে, এজেন্টিক এআই হলো প্রোঅ্যাক্টিভ বা স্বতঃপ্রণোদিত একটি ব্যবস্থা। একে শুধু একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রদান করলেই হয়; এটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে একটি কেন্দ্রীয় যুক্তি ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করে নিজেই সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ধাপগুলো নির্ধারণ করে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল টুলের সমন্বয় ঘটিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এমনকি কাজ করার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা ত্রুটি দেখা দিলে এটি থেমে না গিয়ে নিজেই বিকল্প পথ খুঁজে বের করার মতো অভিযোজনশীলতা প্রদর্শন করে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ ম্যানুয়াল বা পুরাতন আইসিটির ব্যবস্থাপনার দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে নাগরিক সেবাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এস্তোনিয়ার ‘বুরোক্র্যাট’ সিস্টেমের কথা বলা যেতে পারে, যা নাগরিকদের পাসপোর্ট নবায়ন বা পারমিট সংক্রান্ত জটিল ও মাল্টি-স্টেপ কাজগুলো পর্দার আড়ালে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এক নিমিষেই সম্পন্ন করে দেয়। সিঙ্গাপুরের ‘লাইফএসজি’ বা ‘আস্ক জেমি’ এবং যুক্তরাজ্যের পুলিশ বাহিনীতে ব্যবহৃত ‘ববি’ নামক স্বয়ংক্রিয় এজেন্টগুলো ২৪ ঘণ্টা নাগরিক সেবা প্রদান করছে, যা প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর কাজের চাপ প্রায় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।
এজেন্টিক এআই-এর এই স্বায়ত্তশাসন মূলত জটিল নিয়মকানুন ও আইনি বাধ্যবাধকতা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, যা সরকারি দপ্তরের ফাইলের স্তূপ কমাতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সহায়ক। এই পুরো ব্যবস্থাটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হতে পারে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এর প্রতিটি কাজের একটি নিখুঁত অডিট লগ বা ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষিত থাকে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনমতকে সরাসরি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে আমাদের রূপকল্পে ‘সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি শুধু লাইক বা শেয়ার গণনা নয়, বরং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের মন্তব্যের অন্তর্নিহিত মনোভাব বা সেন্টিমেন্ট পরিমাপ করার একটি প্রক্রিয়া। আমার তৈরি এই সিস্টেমে একটি ‘বাবল ম্যাপ’ বা বুদবুদ মানচিত্রের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে দেখানো সম্ভব হয় কোন অঞ্চল থেকে কোনো বিশেষ সরকারি নীতি নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক সেন্টিমেন্ট আসছে।
যেমন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান কেন্দ্র হলেও চট্টগ্রামে ব্যঙ্গাত্মক নেতিবাচক মন্তব্যের হার বেশি, যা নীতিনির্ধারকদের তাদের ভুলত্রুটি শুধরে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে সহয়তা করে। এ প্রযুক্তি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে আস্থার সংকট বা ট্রাস্ট গ্যাপ রয়েছে তা দূর করতে একটি স্বচ্ছ আয়না হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের জন্য আমাদের প্রস্তাবিত এ রূপকল্পটি বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে বলে আমার বিশ্বাস। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকেই প্রযুক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন এবং খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে যে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, আজ তা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রয়োগে মাধ্যমে পূর্ণতা দেওয়ার সময় এসেছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ৩১-দফা রূপকল্পের আলোকে আমাদের তরুণ বিজ্ঞানীরা দেশীয় সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আমাদের কৃষকদের ও তরুণদের অদম্য পরিশ্রম মিলে আমরা গড়ে তুলব একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এ রূপান্তরের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে আমাদের স্বপ্নের উন্নত ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সেবা ও অধিকার প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মই হবে এই পরিবর্তনের অগ্রনায়ক এবং তারাই নির্ধারণ করবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আগামী দিনের নেতৃত্ব।
লেখক : প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য
কেকে/ এমএস