প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ কমানো, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গতি আনা এবং জনবান্ধব কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভার আকার যে কোনো সময় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে রদবদল ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসেরও সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঈদুল আজহার পর এবং বাজেট অধিবেশনের আগে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
সরকারের লক্ষ্য— যেসব মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বেশি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি রয়েছে, সেখানে নতুন নেতৃত্ব যুক্ত করা। একই সঙ্গে একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব একটি মাত্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নীতিও বিবেচনায় রয়েছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। তবে কোনো উপমন্ত্রী নেই। সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় নতুন কয়েকজন পূর্ণমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী যুক্ত হতে পারেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদেও দুজন নতুন সদস্য যোগ হওয়ার আলোচনা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী এবং দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আরেক মন্ত্রীর দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরও পরিবর্তন হতে পারে।
জানা গেছে, কয়েকজন মন্ত্রীর অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং কিছু মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারের কাজের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এ কারণে নতুন মুখ যুক্ত করে প্রশাসনকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিক, পোড়খাওয়া সংগঠক এবং কিছু তরুণ মুখ দেখা যেতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসন থেকে একজনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের নাম আলোচনায় আছে। তবে বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তিনি দায়িত্ব না নিলে অন্য কোনো নারী সংসদ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি বর্তমানে মন্ত্রিসভায় না থাকায় নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক এবং কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন আজিজুল বারী হেলাল, শহিদুল ইসলাম বাবুল, আমিরুল ইসলাম খান আলিম এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল।
টেকনোক্র্যাট কোটায় একজনকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আলোচনার মধ্যেই দেশের প্রকৌশলীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, বর্তমান মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকলেও একজনও প্রকৌশলী না থাকা উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি।
প্রকৌশলীদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বড় অংশই অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি ও নগর ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। এসব খাতের পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণে প্রকৌশল জ্ঞান অপরিহার্য। অথচ নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রকৌশলীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। এ প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি উঠেছে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, শাহরিন ইসলাম তুহিন দীর্ঘদিন ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা এবং পেশাজীবীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার পেশাগত অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ এবং জাতীয় উন্নয়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি মন্ত্রিসভায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তাদের মতে, বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অনেক সিদ্ধান্ত বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক ব্যাখ্যা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এতে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি, ব্যয়-সাশ্রয়, গুণগত মান এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো সবসময় সমান গুরুত্ব পায় না। সেই বিবেচনায় শাহরিন ইসলাম তুহিনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা হবে প্রকৌশলী সমাজের প্রত্যাশার প্রতিফলন এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ।
এ ছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি মাহিদুর রহমানের নাম আলোচনায় আছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
মন্ত্রিসভার বাইরে সংসদ উপনেতা হিসেবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে আরও দুই সদস্য যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারকেও রাজনৈতিক দায়িত্বে আনার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, কোনো মন্ত্রীর কাজের সঠিক মূল্যায়নের জন্য তিন মাস সময় যথেষ্ট নয়। একজন মন্ত্রীর দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বিচার করতে অন্তত চার থেকে ছয় মাস সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গত তিন মাসে সরকারের অনেক মন্ত্রীর পারফরম্যান্স নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা খুব একটা ইতিবাচক নয়। বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর দক্ষতা, যোগ্যতা এবং মন্ত্রণালয় পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে যে ধরনের গতি, উদ্যোগ ও ফলপ্রসূ কর্মকৌশল প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তবে তা অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না।
সাইফুল হক বলেন, কয়েকজন মন্ত্রীর মধ্যে কাজের গতি, পেশাদারত্ব এবং দায়িত্ববোধের ঘাটতি রয়েছে। আবার কোনো কোনো মন্ত্রীর অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করছে, যা সরকারের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক আন্দোলনে ত্যাগী হওয়া এবং একটি মন্ত্রণালয় দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। মন্ত্রিত্বের জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান, প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং পেশাদারত্ব প্রয়োজন। তাই কেবল দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে মন্ত্রী নির্বাচন করা উচিত নয়।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ গঠন, সম্প্রসারণ বা পুনর্গঠন সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। যেহেতু সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় মূলত প্রধানমন্ত্রীর ওপর বর্তায়, তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়ে তাকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন, প্রশাসনিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে যারা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
কেকে/এলএ