মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নিরাপত্তা কোথায়?
ড. মাহবুবুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১:১১ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র দেশ হিসেবে পরিচিত। বহুত্ববাদ, ধর্মীয় সহাবস্থান ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর সহিংসতা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক নিপীড়নের যে অভিযোগ ক্রমাগত সামনে আসছে, তা শুধু দেশটির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না; বরং মানবাধিকার ও সামাজিক সম্প্রীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।

বিধানসভা নির্বাচন শেষে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় মুসলমানদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সামাজিক পর্যবেক্ষকরা দাবি করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে সংখ্যালঘু মুসলমানদের টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে। কোথাও কোথাও বুলডোজার ব্যবহার করে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষত দার্জিলিং ও উলুবেড়িয়ায় মসজিদে হামলা এবং মুসলিম মালিকানাধীন সম্পদ লুটপাটের ঘটনাকে অনেকে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।

এই ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং অনেকের মতে, এগুলো বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রবণতার অংশ। ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ‘হিন্দুত্ববাদ’ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত হয়েছে। এই মতাদর্শের সমালোচকরা মনে করেন, এটি ভারতকে একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্রের পরিবর্তে সংখ্যাগুরু ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। এর ফলে মুসলমানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের ক্রমেই অনিরাপদ ও প্রান্তিক মনে করছে।

পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত। বাংলা সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সামাজিক চেতনার একটি বড় শক্তি ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা। মুসলমান ও হিন্দু শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বসবাস করেছে, একে অপরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে গেছে। অথচ আজ সেই পশ্চিমবঙ্গেই যদি মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয় নিয়ে বসবাস করে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়।

ভারতে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী সহিংসতা, ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা, মুজাফফরনগর, দিল্লি ও অন্যান্য অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজারো পরিবার। এসব ঘটনার প্রতিটি ভারতের গণতান্ত্রিক চেতনাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, এনআরসি এবং ওয়াকফ সংশোধনী নিয়ে বিতর্কও মুসলমানদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, এসব নীতিমালা ও রাজনৈতিক বক্তব্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে মুসলমানদের ‘অন্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তখন তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা বৈষম্যের ঘটনাও সহজে বৈধতা পেয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে অনেকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখছেন।

তবে এই বাস্তবতার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। তাই কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে পুরো ভারতীয় সমাজের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখাও সঠিক হবে না। এখনো ভারতের বহু নাগরিক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক সংগঠন সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাগুলো নিয়েও বিভিন্ন মহল উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ভারতের ভেতরেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি এখনও পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

একটি বিষয় স্পষ্ট-রাষ্ট্র যখন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন শুধু সেই জনগোষ্ঠী নয়, পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমান নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা। যদি কোনো মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজের ঘরবাড়ি, ব্যবসা বা উপাসনালয় নিয়ে আতঙ্কে থাকে, তাহলে সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্রের দাবি দুর্বল হয়ে যায়।

ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্নয়নে মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। তাজমহল, লাল কেল্লা, কুতুব মিনারের মতো স্থাপত্য শুধু মুসলিম ঐতিহ্যের নয়; বরং পুরো ভারতীয় সভ্যতার গর্ব। শিক্ষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, বিজ্ঞান ও রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রেও মুসলমানদের অবদান সুদীর্ঘ। সেই জনগোষ্ঠী যদি আজ নিজেদের নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে সেটি শুধু একটি সম্প্রদায়ের সংকট নয়; বরং ভারতের বহুত্ববাদী পরিচয়ের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

যে কোনো দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা, বৈষম্য বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বৈশ্বিক নৈতিকতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিপীড়নের অভিযোগের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উচিত ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তোলা। ইউনাইটেড ন্যাশনস, অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইট ওয়াচ-এর মতো সংস্থাগুলো স্বাধীন পর্যবেক্ষক পাঠিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারে। তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সচেতনতা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দ্বিতীয়ত, বড় শক্তিধর ও উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উচিত মানবাধিকারের প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা কিংবা অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্র যদি ধারাবাহিকভাবে সংখ্যালঘু অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের পক্ষে বক্তব্য দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়। তবে এই চাপ যেন রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার না হয়ে প্রকৃত মানবিক অবস্থানের প্রতিফলন হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় প্রচারণা বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাস্তব ঘটনা চাপা পড়ে যায়। স্বাধীন সাংবাদিকতা, মানবাধিকার ডকুমেন্টেশন ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

চতুর্থত, প্রতিবাদ অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা, উসকানি বা প্রতিশোধমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বরং মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাষায় প্রতিবাদ গড়ে তোলা জরুরি।

বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার শুধু কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক নৈতিকতারও অংশ। তাই পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের যে কোনো অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়; বরং আইনের শাসনই হওয়া উচিত বিচার প্রক্রিয়ার ভিত্তি। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত নির্বাচনি লাভের জন্য ধর্মীয় বিভাজনকে ব্যবহার না করা। কারণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকে অস্থির করে তোলে।

আজ সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো-ঘৃণার বদলে সহাবস্থান, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং বিভাজনের বদলে মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের নিরাপত্তার প্রশ্ন তাই শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক সম্প্রীতি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো সমাজ দীর্ঘদিন ঘৃণা ও বৈষম্যের ওপর দাঁড়িয়ে টিকে থাকতে পারে না। স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়নের পথ একটাই- সব নাগরিকের সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যে কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে ন্যায়বিচার ও সামাজিক সম্প্রীতির পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে।

 লেখক : শিক্ষক-রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ 

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close