গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সচিবালয়ের ভেতরে বদলি-বাণিজ্য, তদবির ও প্রভাব বিস্তারের অদৃশ্য রাজনীতি যেন অনেকটা আগের ছন্দেই চলছে। কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রভাবশালী পিএস, এপিএস ও ঘনিষ্ঠ সহকারীদের ঘিরে গড়ে ওঠা অঘোষিত ক্ষমতার বলয় নিয়ে এখনো নানা অভিযোগ রয়েছে।
বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি থেকে শুরু করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগে প্রভাব, ফাইল নিষ্পত্তি ও কমিশন আদায়ের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়মিতই সামনে আসছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও সচিবালয়ে প্রতিদিন ভিড় করছেন তদবিরকারী, দালাল ও সুবিধাভোগী চক্রের লোকজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে গতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। দলীয় নেতাকর্মী, সংসদ সদস্য ও সাধারণ মানুষের অনেকেই মনে করেন, তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি সংবেদনশীলতা ইতোমধ্যে দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে প্রশাসনের ভেতর দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক প্রভাব কাঠামো ও সুবিধাভোগী চক্র ভাঙা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও প্রশাসনের ভেতরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও প্রশাসনের সেই সংস্কৃতি পুরোপুরি বদলেছে, এমন বার্তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সরেজমিন দেখা যায়, সচিবালয়ে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ, তদবির ও ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে ঘোরাঘুরি করছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবনের করিডর, মন্ত্রীর দপ্তরের সামনে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কক্ষের আশপাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তাদের। কেউ এসেছেন বদলি বা পদায়নের তদবির নিয়ে, কেউ নিয়োগ বা পদোন্নতির সুপারিশ করতে, আবার কেউবাদ সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার, বিল ছাড় কিংবা ব্যবসায়িক অনুমোদনের জন্য প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক তদবির সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। বিশেষ করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের পিএস, এপিএস এবং ঘনিষ্ঠ স্টাফদের আশপাশে এসব তদবিরকারীদের আনাগোনা বেশি দেখা যায়।
সচিবালয় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ফাইল দ্রুত করানো, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। এতে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তারাও নানা ধরনের অঘোষিত চাপের মুখে পড়েন।
এদিকে সচিবালয়কে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে। তারা নিজেদের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষ, ঠিকাদার কিংবা চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। অনেকেই দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তদবির বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রীদের রাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে কাছের বলয় তৈরি হয় তাদের পিএস, এপিএস ও ব্যক্তিগত স্টাফদের ঘিরে। এ বলয়ের অনেকেই সরকারি কাঠামোর বাইরে থেকেও অঘোষিত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অভিযোগ, ফাইল ছাড়, বদলি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে এসব ব্যক্তিদের ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাজ এগোচ্ছে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে নিয়মিতই নানা আলোচনা-সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে হঠাৎ করে পরিবর্তন, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া কিংবা অপ্রত্যাশিতভাবে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত সামনে এলে তা নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে সমালোচনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
আবার পদোন্নতির ক্ষেত্রে, একই ব্যাচ বা সমমানের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একজনকে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়ায় অন্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে তখন ‘যোগ্যতার বদলে সুপারিশ কাজ করেছে’ এমন মন্তব্য করতে দেখা যাচ্ছে। তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পরও মানুষ ‘পুরোনো সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা’ রয়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, ক্ষমতা বদলালেও ক্ষমতার আশপাশের সুবিধাভোগী চক্র বদলায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সরকার পরিবর্তন করে এ চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নিয়োগে স্বচ্ছতা, পিএস-এপিএসদের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ, সম্পদের বাধ্যতামূলক হিসাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ডিজিটাল ট্র্যাকিং না আনলে একই চিত্র বারবার ফিরে আসবে। কারণ বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে একটি ‘অদৃশ্য প্রভাব বলয়’ তৈরি হয়েছে, যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব খাটিয়েছেন।
তাদের মতে, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু আগের সরকারের দুর্নীতি উদঘাটন নয়, বরং নিজেদের প্রশাসনিক বলয়ের ভেতরেও একই সংস্কৃতি তৈরি না হতে দেওয়া। নইলে গণঅভ্যুত্থান, পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি সবই শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে আস্থাহীনতায় পরিণত হবে।
সরকার ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি, মাঠপর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি খোঁজখবর নেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তার সক্রিয়তা ইতোমধ্যে সরকারের ভেতরে ও বাইরে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্যের মতে, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সমন্বিত সহযোগিতা থাকলে প্রধানমন্ত্রী আরও দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবেন। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে তার লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য, তরুণ উপদেষ্টা ও নীতিনির্ধারকের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছে গুঞ্জন রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক নিয়োগ, প্রকল্প অনুমোদন এবং নীতিগত দিকনির্দেশনায় এই বলয়ের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক পূর্ণমন্ত্রী বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত হচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে। এমনকি অনেক বিষয়ে মতামত দিলেও তা গুরুত্ব পায় না।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, গত দুই দশকে প্রশাসনকে চরমভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে, যার ফলে পেশাগত দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনকে প্রজাতন্ত্রের সেবকের পরিবর্তে সরকার বা দলের অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার যে উত্তরাধিকার দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে, বর্তমান সরকারও সেই প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পারছে না। কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রে এখনো দলীয় পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
পেশাদারত্ব, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো না গেলে পুরোনো আমলের নেতিবাচক চর্চাগুলোই ভিন্নরূপে ফিরে আসবে।
তিনি বলেন, প্রশাসন সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো একটি মৌলিক নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রশাসন কি কোনো নির্দিষ্ট দল বা সরকারের অনুগত হবে, নাকি এটি প্রজাতন্ত্রের একটি স্বাধীন ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন ও তরুণ মুখ রয়েছেন যাদের পূর্ববর্তী প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া শূন্যতা পূরণে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিশালসংখ্যক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার ফলে নিয়মিত সার্ভিসে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, যা প্রশাসনের গতিশীলতাকে ব্যাহত করতে পারে।
সাইফুল হক বলেন, প্রশাসনে দক্ষ জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো দলীয় আনুগত্য এবং আঞ্চলিকতা বিবেচনা করার যে প্রবণতা রয়েছে, তা প্রশাসনের গুণগত মান নষ্ট করছে। এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে যদি মেধা ও পেশাদারত্বকে গুরুত্ব দেওয়া না হয়, তবে একটি আদর্শ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। প্রশাসনের এ সামগ্রিক সংস্কারের জন্য সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলী পরিকল্পনা প্রয়োজন, কারণ এর তাৎক্ষণিক সমাধান নেই।
তিনি আরও বলেন, জনগণের সমস্যা সমাধানে এবং পরিবর্তনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যে আন্তরিকতা এবং কাজের গতি দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। নতুন দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রীদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত পড়াশোনা, জানাশোনা এবং অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাকে সফল করতে হলে মন্ত্রীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের কাজে গতি আনা এখন অত্যন্ত জরুরি।
কেকে/ এমএস