দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব, আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও দেশের হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র আইসিইউ সংকট। একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য হন্যে হয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা, কিন্তু শয্যা খালি না থাকায় পথেই প্রাণ হারাচ্ছে অনেক শিশু। চিকিৎসার এই চরম সংকটে অসহায় বাবা-মায়ের চোখের সামনেই নিভে যাচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
শয্যা সংকটের কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন এখন সুতোর ওপর ঝুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে হামের এই প্রাদুর্ভাব দেশকে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
গত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এ সংক্রামক ব্যাধি। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার এবং জটিলতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে উদ্বেগের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা। আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে যে আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন, তার তীব্র সংকটে অকালেই ঝরে যাচ্ছে শত শত প্রাণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য এবং বিভিন্ন হাসপাতালের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট আইসিইউ শয্যা সংখ্যা চাহিদার তুলনায় বেশ কম। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই সংকট আরও তীব্র।
সারা দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ১৩০০-এর একটু বেশি। তবে এর বড় একটি অংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আইসিইউ শয্যা সংখ্যা প্রায় ৭০০ থেকে ৯০০টি। সব মিলিয়ে দেশে নিবন্ধিত আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ২০০০ থেকে ২৫০০-এর আশপাশে।
শিশুদের জন্য বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের অবস্থা আরও নাজুক। সরকারি বড় হাসপাতালগুলোতে গড়ে ১০ থেকে ২০টির বেশি বেড থাকে না, যা বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের মতো সময়ে একেবারেই অপ্রতুল।
মোট আইসিইউর প্রায় ৭৫% থেকে ৮০% কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের জন্য এই সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, অনেক জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হলেও দক্ষ চিকিৎসক এবং নার্সের অভাবে সেগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১০১টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও অনেক সময় রক্ষণাবেক্ষণ বা জনবল সংকটে পূর্ণ সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জনসংখ্যা অনুপাতে যেখানে প্রতি ৫ থেকে ১০ জন মুমূর্ষু রোগীর জন্য ১টি আইসিইউ শয্যা থাকা প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক হাজার রোগীর বিপরীতে মাত্র ১টি শয্যা বরাদ্দ রয়েছে। এ তীব্র অসামঞ্জস্যই হামের মতো প্রাদুর্ভাবের সময় মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শয্যাজুড়ে অসুস্থ শিশু, মা-বাবার চোখে শুধুই অনিশ্চয়তা
বিশাল হলরুমের মতো কক্ষটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক বিষণ্ন দৃশ্য। সারি সারি বিছানায় শুয়ে আছে অসুস্থ শিশুরা, যাদের শরীরের কোমল ত্বকে ফুটে উঠেছে হামের লালচে ফুসকুড়ি। কেউ ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউবা ব্যথায় গুমরে কাঁদছে। সেই কান্নার শব্দে ভারী হয়ে আছে চারপাশের বাতাস।
সন্তানকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ক্লান্ত স্বজনরা। এর মাঝেই দ্রুত পায়ে ছুটছেন নার্সরা। দক্ষ হাতে কারও ক্যানুলা ঠিক করছেন, কাউকে লাগিয়ে দিচ্ছেন স্যালাইন। শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুদের নেবুলাইজার দিচ্ছেন অভিভাবকরা নিজেরাই। রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের এই ওয়ার্ডজুড়ে এখন শুধুই আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছায়া। প্রতিটি অভিভাবকের চোখেমুখে স্বজন হারানোর শঙ্কা আর গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট।
করোনা মহামারি মোকাবিলার সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটের জন্য তৈরি করা এই ভবনে গড়ে তোলা হয় হাসপাতাল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালটিকে হাম ডেডিকেটেড করা হয়েছে। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় এ সাধারণ ওয়ার্ডে প্রায় ৪০০ বিছানা রয়েছে। প্রতিটি বিছানা পূর্ণ হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে ১০৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৫১। এর মধ্যে আইসিইউতে রয়েছে ৪৮টি শিশু। তারা হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১০৬ শিশুর সবাই হামে আক্রান্ত।
দেশের চলমান মারাত্মক হামের প্রকোপের মধ্যে কমবেশি অবস্থা খারাপ হাজারো অভিভাবকের। সন্তানের দীর্ঘ চিকিৎসা তাদের অনেকের জন্যই আর্থিক চাপের সৃষ্টি করেছে। কারও কারও জন্য আর্থিক ব্যয়ের বিষয়টি বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে। হামে আক্রান্ত শিশুকে একটি হাসপাতালে নিলেই সুস্থ হচ্ছে—এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। শিশুদের নিয়ে ছুটতে হচ্ছে একাধিক জায়গায়।
সরকারি হাসপাতালে খরচ তুলনামূলকভাবে কম হলেও বাস্তবে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর বড় অংশ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ জটিলতা দেখা দিলে একাধিক হাসপাতালে যেতে বা নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ/পিআইসিইউ) সেবা নিতে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স, যাতায়াত ও দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থানের খরচ পরিবারগুলোকে বিপদে ফেলছে। শিশুর পাশে থাকতে গিয়ে বাবা-মায়ের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেককেই ধারদেনা করে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।
হামের থাবায় নিভে গেল আরও ৭ প্রাণ
দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে একজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল; বাকি ৬ জনের মধ্যে ছিল হামের উপসর্গ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামসংক্রান্ত নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার একই সময় পর্যন্ত ১৫৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
এই সময়ে ১ হাজার ৩৬৩ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ১০৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সংক্রমণের বর্তমান চিত্র
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। হাম সাধারণত একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং সচেতনতার অভাবে এটি এখন প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে।
যমজ সন্তান কোলে, একটি মৃত, অন্যটির হাম
বাবার কোলে এক সন্তান। মৃত, শরীর পুরোটা কাপড়ে মোড়ানো। মায়ের কোলে আরেক সন্তান। জীবিত, তবে অসুস্থ। হাম পুরোটা সারেনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে বের হচ্ছিলেন এই মা-বাবা। তাদের দেখে জানতে চাইলাম কী হয়েছিল। তারা জানালেন, তাদের যমজ সন্তান রাইসা ও রুমাইসা। দুজনই হামে আক্রান্ত হয়েছিল। রাইসাকে বাঁচানো যায়নি।
বাবা-মায়ের নাম কামরুজ্জামান ও জান্নাতি বেগম। এবারের হামে যে শত শত মা-বাবা সন্তান হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুজন তারা। বাড়ি ফরিদপুরে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলাম নারীদের ফিস্টুলা সমস্যা নিয়ে প্রতিবেদনের কাজে। সেখানে গিয়ে গত বুধবার বেলা দেড়টার দিকে দেখা হয়ে যায় এ পরিবারের সঙ্গে। তাদের তখন বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা। অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়েছে। তারা ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। এ ফাঁকে কিছু সময় কথা বলার সুযোগ হয়।
পরিবারটি জানায়, পাঁচ মাস বয়সী রাইসা ও রুমাইসার জন্ম হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই। জন্মের পর নানা জটিলতায় ১৫ দিন নবজাতকদের বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে ছিল ওরা। সকালে বাবা-মায়ের কোলে চড়ে এই দুই বোন আবার এসেছিল হাসপাতালটিতে, হামে আক্রান্ত হয়ে।
বাবা কামরুজ্জামান বললেন, সকালে তারা ফরিদপুর সদর হাসপাতাল থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে আসেন। বেলা ১১টার দিকে রাইসা মারা যায়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামকে শুধু সাধারণ জ্বর-ঠান্ডা মনে করা বড় ভুল। চিকিৎসকরা জানান, হামের কারণে যখন ফুসফুস বা মস্তিষ্কে সংক্রমণ ছড়ায়, তখন যান্ত্রিক শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়া রোগীকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে আইসিইউ সংকটের কারণে অনেক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
কেকে/এলএ