রাশিয়ার বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নাট্যকার আন্তন পাভলোভিচ চেখভ বলেছেন, একজন সাংবাদিক হচ্ছেন সমালোচক, প্রশ্নকারী এবং পরামর্শদাতা। আর সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা যাদের নিত্যদিনের কাজ, তারাই মফস্বল সাংবাদিক। মফস্বল সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি থেকে কাজ করেন। তৃণমূল মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা, স্থানীয় অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবহেলা প্রকাশ করা, কেন্দ্র ও প্রান্তিক জনপদের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধন তৈরি করা, দুর্যোগ, নির্বাচন বা সামাজিক সংকটে তাৎক্ষণিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া—এসবই তাদের কাজ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মফস্বল সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী গ্রাম ও জেলা পর্যায়ে বসবাস করে। তাই জাতীয় উন্নয়ন, সুশাসন ও জনস্বার্থ রক্ষায় মফস্বল সাংবাদিকদের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ডেস্কে বসে নয়, বরং মাঠে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করাই মফস্বল সাংবাদিকদের মূল কাজ।
রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো গণমাধ্যম। আর সেই গণমাধ্যমের সবচেয়ে শক্তিশালী কিন্তু সবচেয়ে অবহেলিত অংশ হচ্ছে মফস্বল সাংবাদিকতা। রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদ প্রবাহের বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, গ্রাম-গঞ্জ, উপজেলা কিংবা জেলা শহরের মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সম্ভাবনা, অনিয়ম-দুর্নীতি ও জনজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন মফস্বল সাংবাদিকরা। মূলত তারাই দেশের তৃণমূল বাস্তবতার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি জাতির সামনে উপস্থাপন করেন। ইংরেজি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জর্জ অরওয়েলের মতে, সাংবাদিকতা হলো সেই সত্য প্রকাশ করা, যা কেউ গোপন রাখতে চায়। আর সেই সত্য প্রকাশ করতেই একজন মফস্বল সাংবাদিক নিরলসভাবে কাজ করেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বহুমুখী চ্যালেঞ্জ, ঝুঁকি ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মফস্বল সাংবাদিকতার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা, অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা, কৃষকের দুর্দশা, পরিবেশ বিপর্যয়, সামাজিক অবক্ষয় কিংবা দুর্নীতির নানা চিত্র প্রথম উঠে আসে মফস্বল সাংবাদিকদের কলম ও ক্যামেরার মাধ্যমে। অনেক সময় একটি ছোট উপজেলার সংবাদ জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়, প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে, এমনকি নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ মফস্বল সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
তবে বাস্তবতা হলো, রাজধানীর সাংবাদিকদের তুলনায় মফস্বল সাংবাদিকরা অনেক বেশি প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নেই পর্যাপ্ত আর্থিক নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা কিংবা পেশাগত সুরক্ষা। অনেকেই সামান্য সম্মানি কিংবা কোনো সম্মানি ছাড়াই সংবাদ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ দিনের পর দিন তারা মাঠে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। দুর্নীতি, মাদক, বালু দস্যুতা, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের অপকর্মের সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সময় হুমকি, হামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। কোথাও মামলা, কোথাও সামাজিক চাপ, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মুখোমুখি হয়ে পেতে হয় অহেতুক রাজনৈতিক ট্যাগ। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
মফস্বল সাংবাদিকদের অন্যতম একটি বড় সংকট হলো পেশাগত স্বীকৃতির অভাব। রাজধানীকেন্দ্রিক মিডিয়া কাঠামোর কারণে অনেক সময় তাদের শ্রম ও অবদান যথাযথ মূল্যায়ন পায় না। জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয় না। আবার অনেকেই দীর্ঘদিন কাজ করেও স্থায়ী নিয়োগ, বেতন কাঠামো বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। ফলে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পেশাগত হতাশা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় পেশাদার সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মফস্বল সাংবাদিকদের দায়িত্বও অনেক বেশি। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে গুজব, অপপ্রচার কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই তথ্য যাচাই, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে তাদের আরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবে তারা পিছিয়ে পড়ছেন।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মফস্বল সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ সংগ্রহের কাজ নয়; এটি অনেকাংশে জনস্বার্থ রক্ষার লড়াই। প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা, অবহেলিত অঞ্চলের সমস্যা সামনে আনা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত সাহসিকতার কাজ। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ উপেক্ষা করেও সত্য প্রকাশ করতে হয়। ফলে তাদের কাজের পরিধি যেমন কঠিন, তেমনি দায়িত্বও অনেক বেশি।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্বও কম নয়। মফস্বল সাংবাদিক একটি পত্রিকার প্রাণ। তাদের টিকিয়ে রাখতে নেওয়া যেতে পারে একগুচ্ছ পদক্ষেপ। প্রথমত, মফস্বল সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা কিংবা হয়রানির ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে সংবাদকর্মীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোকে মফস্বল সাংবাদিকদের ন্যায্য সম্মানি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সংবাদ সংগ্রহ নয়, তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, সাংবাদিকতার নৈতিক মান রক্ষায়ও গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে অপসাংবাদিকতা ও পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এজন্য প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকদের মূল্যায়নের পাশাপাশি ভুয়া সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। কারণ গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ তথা সমাজ।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, মফস্বল সাংবাদিকদের কেবল সংবাদকর্মী হিসেবে দেখলে চলবে না; তারা সমাজের বিবেক, স্থানীয় জনগণের আস্থার প্রতীক এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অন্যতম রক্ষক। রাজধানীর বাইরের বাংলাদেশকে জানতে হলে মফস্বল সাংবাদিকতার দিকে তাকাতেই হবে। কারণ প্রকৃত বাংলাদেশ বাস করে গ্রামগঞ্জে, প্রান্তিক জনপদে। আর সেই বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র প্রতিদিন তুলে ধরছেন মফস্বল সাংবাদিকরাই।
আজকের বিশ্বে তথ্যই শক্তি। আর সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস নিশ্চিত করতে হলে মফস্বল সাংবাদিকতার বিকাশ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকির মধ্যেও যারা সত্য প্রকাশের প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বশীল আচরণ অতীব প্রয়োজন। কারণ শক্তিশালী গণতন্ত্র, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং সচেতন সমাজ গঠনে মফস্বল সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই।
সত্য প্রকাশের এই সংগ্রাম সহজ নয়। তবু নানা বাধা, ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তার মাঝেও মফস্বল সাংবাদিকরা কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। তাদের এই সাহস, দায়বদ্ধতা ও পেশাগত নিষ্ঠাই গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখছে। তাই সময় এসেছে মফস্বল সাংবাদিকতাকে শুধু সহানুভূতির চোখে নয়, রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বের জায়গা থেকে দেখার। তাহলেই সত্য প্রকাশের এই প্রত্যয় আরও শক্তিশালী হবে, উপকৃত হবে দেশ তথা সমাজ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট