মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মাজারে হামলা বন্ধে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীর মিরপুরে হজরত শাহ আলী বাগদাদীর মাজারে হামলার ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের ওপর চলমান চাপের আরেকটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত। 

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক মাজারে ঢুকে জিয়ারতকারীদের মারধর করে এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয়রা এবং পুলিশের একাধিক বক্তব্যে ঘটনার বিবরণে অসামঞ্জস্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট : আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি ভয়াবহভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। 

এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের আগেই রাজনৈতিক দোষারোপ শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ হামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন; পুলিশও ‘তাদের কিছু লোক থাকতে পারে’ বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। 

অন্যদিকে দলটি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হামলাকারী যে-ই হোক, শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে, পুলিশের গাড়ি মাজারের বাইরে থাকা সত্ত্বেও কেন তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ হলো না? রাষ্ট্রের উপস্থিতি যদি কেবল দর্শকের মতো হয়, তবে জনতার হাতে বিচার প্রতিষ্ঠার প্রবণতা আরও বাড়বে। 

মাদক সেবনের অভিযোগ থাকলে তার মোকাবিলার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। মাদকবিরোধী অভিযান কোনোভাবেই লাঠিসোঁটা হাতে দলবদ্ধ হামলা, মারধর কিংবা ধর্মীয় স্থানে ভাঙচুরকে বৈধতা দেয় না। বাংলাদেশে বহু মাজার, দরগাহ ও খানকাহ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এগুলো লোকঐতিহ্য, সুফি সংস্কৃতি এবং সামাজিক সহাবস্থানের অংশ। একটি স্থানে অপরাধের অভিযোগ থাকলে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে, কিন্তু পুরো প্রতিষ্ঠান বা অনুসারীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো সভ্য রাষ্ট্রের পদ্ধতি হতে পারে না।

উদ্বেগের জায়গা আরও গভীর। গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাকাম : সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ-এর তথ্যমতে, ২০২৪-পরবর্তী ১৭ মাসে দেশে অন্তত ৯৭টি মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা হয়েছে; এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩ জন এবং আহত শত শত মানুষ। অথচ এসব ঘটনায় মামলা কম, তদন্তের অগ্রগতি সীমিত, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আরও বিরল। এই দায়হীনতাই নতুন হামলাকারীদের উৎসাহ জোগায়। 

সরকারের উচিত বিষয়টিকে কেবল ‘স্থানীয় বিরোধ’ বা ‘মাদক সংক্রান্ত ঘটনা’ বলে খাটো না করা। যখন ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট ধরনের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলা হয়, তখন তা জননিরাপত্তার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়।

এখন সরকারকে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, শাহ আলী মাজার হামলার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ মাজার, মন্দির, দরগাহসহ ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া অন্য কারও ‘স্বেচ্ছা অভিযান’ বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, সামাজিক মাধ্যমে গুজব, উসকানি ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, সরকারকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে যে, বাংলাদেশে কোনো মতাদর্শিক বা নৈতিক অজুহাতে মব জাস্টিস  বরদাশত করা হবে না।

রাষ্ট্র যদি সময়মতো স্পষ্ট বার্তা না দেয়, তাহলে আজ মাজার, কাল অন্য কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিসর একই ধরনের হামলার শিকার হবে। আইনহীন জনআক্রোশ কখনো নৈতিক সমাজ গড়ে না; বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে ক্ষয় করে। শাহ আলী মাজারের ঘটনা তাই কেবল একটি রাতের সহিংসতা নয়, এটি সরকারের জন্য আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close