মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল এবং কুলাউড়া উপজেলায় ৩৩৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত স্কুল ফিডিং (মিড ডে মিল) কর্মসূচি সাময়িক বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হঠাৎ খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখায় চরম বিপাকে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। ফলে দুই দিন ধরে বাড়ি থেকে টিফিন আনতে বাধ্য হচ্ছে তারা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত এ কর্মসূচিতে শ্রীমঙ্গল ১৩৮টি এবং কুলাউড়া উপজেলায় ১৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্কুল ফিডিং প্রকল্পের শুরু থেকেই মৌলভীবাজার জেলায় খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। গত ৭ মে দৈনিক খোলা কাগজের শেষ পাতায় ‘পচা-বাসি খাবারে ঝুঁকিতে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা, মেয়াদোত্তীর্ণ বনরুটি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। একই বিষয়ে খোলা কাগজের মাল্টিমিডিয়ায়ও সংবাদ প্রকাশ হয়।
সংবাদের পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিসহ উপজেলা প্রশাসন থেকে এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। একইসঙ্গে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয় এবং জেলা থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়।
প্রতিবেদনের চারদিন পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে ফিডিং প্রজেক্টের একটি টিম সরেজমিন তদন্তে আসে। টিমের সদস্যরা শ্রীমঙ্গল উপজেলার টিকরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ঘুরে প্রতিবেদনের সত্যতা যাছাই করে অধিদপ্তর প্রতিবেদন জমা দেন।
সম্প্রতি স্কুল ফিডিং বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের খাদ্যের মান ও পরিমাণ নিশ্চিতে কড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব অবহেলায় শৈথিল্য বা অনিয়ম পাওয়া গেলে মামলা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের বরাদ্দকৃত পুষ্টিকর খাবার শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে কুলাউড়া এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ বনরুটি, নষ্ট ডিম ও কাঁচা কলা। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ অভিভাবক ও শিক্ষকদের।
রোববার (১৭ মে) সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা স্কুলের মিড-ডে মিল না পেয়ে পাশের দোকান থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণ দেব জীবন বলেন, গত বৃহস্পতিবার তার স্কুলে একটি আইটেম (ডিম) সরবরাহ করা হলেও গত শনিবার এবং রোববার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইসলাম ট্রেডার্স’ কোনো খাবার সরবরাহ করছে না। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার আমি শিক্ষক গ্রুপ থেকে জানতে পেরেছি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দুই থেকে তিন দিন খাবার সরবরাহ সাময়িক স্থগিত রেখেছে। পরদিন শুক্রবার থাকায় হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি সকল শিক্ষার্থীকে জানাতে পারিনি। এতে অনেক শিক্ষার্থী টিফিন না আনায় বিপাকে পড়েছে।
তিনি বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা মিড-ডে মিল থেকে এভাবে বঞ্চিত হবে তা কাম্য নয়। এর আগেও প্রায় এক সপ্তাহ খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখে ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া খাবারের মান ও পরিমাণ দুটোই কমেছে। এসব বিষয় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমরা আগেও একাধিবার অবগত করেছি। আমাদের দাবি স্কুল ফিডিং কর্মর্সচিতে যেনো নিয়মিত মানসম্মত খাবার চাহিদামতো সরবরাহ করা হয়।
উপজেলার কুঞ্জবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. একরামুল কবীর বলেন, গতকাল এবং আজ স্কুলে মিড-ডে মিল কার্যক্র বন্ধ রয়েছে। আগামী আরো দুদিন স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের খাবার সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে বলে শিক্ষা অফিস থেকে গত বৃহস্পতিবার জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল এবং কুলাউড়ার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ বনরুটি বিতরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দেওয়া কলার খোসা কালো, কাঁচা ও নিম্নমানের বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কিছু বিদ্যালয়ে বিতরণ করা ডিম নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে কুলাউড়ার হোসেনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নূর জাহান বেগম, প্রতাবী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খায়রুল ইসলাম খান, পাঁচপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন এবং রাঙ্গিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুশিল চন্দ্র দাসের সঙ্গে কথা হলে তারা খাদ্যের মান নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।
একই চিত্র শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, সরবরাহকৃত বনরুটির বিএসটিআই অনুমোদন রয়েছে। যদিও পণ্যের মোড়কে তার কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অনুমোদিত পলির সংকটের কথা উল্লেখ করে শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া উপজেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের খাবার সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্স। তবে খাবার সরবরাহ সাময়িক স্থগিত রাখার বিষয়ে শ্রীমঙ্গল এবং কুলাউড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানিয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর মো. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও বিএসটিআই অনুমোদিত পলির সাময়িক সংকটের কারণে স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের আওতাধীন খাবারের প্যাকেজিং ও সরবরাহ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। অনুমোদিত পলি ব্যতীত সাদা পলিতে খাদ্যসামগ্রী প্যাকেজিং করা সম্ভব নয় বিধায় আগামী দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের খাবার সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সাপেক্ষে যথাশীঘ্রই পুনরায় সরবরাহ কার্যক্রম চালু করা হবে বলে আশা প্রকাশ করছি।
খাবারের মান নিয়ে ইসলাম ট্রেডার্সের স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা খাইরুল বাশার বলেন, সিলেট বিভাগের শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, বাহুবল ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় আমরা খাবার সরবরাহ করছি। আমরা বিএসটিআই অনুমোদিত কারখানা থেকে খাবার সংগ্রহ করি। কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল মিলিয়ে ৩৩৪টি স্কুলে প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য খাবার সরবরাহ করছি। কোথাও সমস্যা হলে শিক্ষকদের বদলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে।
তিনি আরো বলেন, যে পলির নমুনা অনুমোদন করিয়ে আনা হয়েছিল, এখন সেটার চাহিদা সারা দেশে বেড়ে গেছে। শুধু আমাদেরই প্রতি মাসে তিন থেকে চার টন প্রয়োজন হচ্ছে। এতে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে এবং দামও বেড়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বলছে, বিএসটিআই অনুমোদিত প্যাকেজিং পলি না পাওয়ায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খাবার সরবরাহ সাময়িক স্থগিত রেখেছে।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার লিখিতভাবে আমাদের জানিয়েছে, বিএসটিআইয়ের পলি প্যাকেটিং না পাওয়ায় তারা আগামী দুই-তিন দিন খাবার সরবরাহ করতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, গত সপ্তাহে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় স্কুল ফিডিংয়ের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠে। পরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত দল সরেজমিনে টিকরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যায়। অধিদপ্তর থেকে আসা তদন্ত কমিটি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তবে শুনেছি তারা তদন্ত করেছে এবং প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠিয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হয়তো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত বনরুটির প্যাকেট বিএসটিআই অনুমোদিত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু রয়েছে। ইসলাম ট্রেডার্স সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহ করছে।
এ ব্যাপারে কুলাউড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. খুরশেদ আলম বলেন, গত দুই দিন কুলাউড়া উপজেলার সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে খাবার সরবরাহ না করায় মিড-ডে মিল বন্ধ রয়েছে। কতদিন বন্ধ থাকবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলছি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ডাকা হয়েছে। বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগের বিষয়েপ্রশ্ন করলে তিনি বলেন, উপজেলায় ১৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কলা, ডিম ও বনরুটি সরবরাহ করা হয়। ৫ থেকে ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থাকতে পারে। কোথাও কলা বেশি পাকা বা কম পাকা হয়, আবার বনরুটির প্যাকেটেও সমস্যা ছিল। নষ্ট ডিমের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ২৩ হাজার ডিম সরবরাহ করা হয়। কোনো কোনো জায়গা থেকে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়মিত এমন হচ্ছে না।
মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল আলম জানান, দুই দিন ধরে শ্রীমঙ্গল এবং কুলাউড়া উপজেলায় খাবার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি আমাকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসার জানিয়েছেন। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চিঠির মাধ্যমে খাবার সরবরাহ সাময়িক স্থগিত রাখার বিষয়টি তারা জানিয়েছেন।
খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের বিষযে তিনি বলেন, আপনাদের মাধ্যমে অভিযোগগুলো পেয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি, যখন যে অভিযোগ পাই তখনই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়। শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে এবং খাদ্যের মান যাচাইয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি এই নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে খাদ্যের মান ও পরিমাণ নিশ্চিত করা যাবে।
কেকে/ এমএস