কথায় বলে, আইন আছে, প্রয়োগ নেই। প্রবাদটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাস্তবতা জানতে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজস্ব আদায়ের সংস্থার নাম নিবন্ধন অধিদপ্তর। এ অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে প্রায় ৪৯৭টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস রয়েছে, যেখানে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। সরকার প্রতিটি থানায় একজন করে রেজিস্ট্রার নিয়োগ দিয়েছে। অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেন না। তার প্রমাণস্বরূপ রাজধানীর গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের ক্ষেত্রে নজির সৃষ্টি করা ঘটনা ঘটেছে। এ সাব-রেজিস্ট্রার ঠান্ডা মাথায় সুকৌশলে দুর্নীতির কারিগর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তুরুপের তাস বানিয়েছেন ‘নকলনবিশ’ গিয়াস উদ্দিনকে। তিনি অফিসের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেন না।
গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে দলিলের শ্রেণি পরিবর্তন, ক্ষমতার অপব্যবহার, বসতভিটার জমির দলিল ‘নাল জমি’ দেখিয়ে তিনগুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি ‘টক অব দ্য’ গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে ৮৪৬৫-৮৩৬৯ নম্বর বায়না দলিলের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়া সাব-কবলা দলিল নম্বর ৩৪৫৯ (৩ মে ২০২৬) নিয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। দাতা নাজিম উদ্দিন গং, পিতা মো. বছর মিয়া, প্রায় ১০.৬৬ কাঠা জমি হস্তান্তর করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে জমিটি বসতভিটা হলেও দলিলে ‘নাল জমি’ হিসেবে জমির দাম কম দেখিয়ে দলিল সম্পাদন করানো এবং সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক অনিয়ম, দুর্নীতি ও দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলার চরমে উঠেছে। বিশেষ করে ‘নকলনবিশ’ গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে সেবা প্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের কূটকৌশল অবলম্বন করে সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে, যা দিয়ে রমরমা ‘রেজিস্ট্রেশন-বাণিজ্য’ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, জোরপূর্বক দলিল রেজিস্ট্রি করানো এবং সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
সূত্র জানায়, মাত্র ২৪ টাকার কর্মচারী ‘নকলনবিশ’ গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রণ করছেন। অথচ সাব-রেজিস্ট্রার নির্বিকার। দাপুটে নকলনবিশ গিয়াস উদ্দিন মাদক ব্যবসায়ী ও নারী সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য। এই নকলনবিশ গিয়াস উদ্দিন গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। তার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, তিনি প্রভাব খাটিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারদেরও মিথ্যা তথ্য দিয়ে দলিল সম্পন্ন করাতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব ফাঁকির মহা-উৎসবের মাধ্যমে নকলনবিশ গিয়াস উদ্দিন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ অফিস পরিচালনা করছেন।
সম্প্রতি বায়না দলিলের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়া সাব-কবলা দলিল নম্বর ৩৪৫৯ (৩ মে ২০২৬) নিয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় ১০.৬৬ কাঠা জমি হস্তান্তর করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে জমিটি বসতভিটা হলেও দলিলে তা ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখানো হয়, যাতে প্রায় তিনগুণ অর্থ কম উল্লেখ করা হয়। ফলে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নকলনবিশ এবং সাব-রেজিস্ট্রারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এ নকলনবিশের হাত ধরে।
এদিকে আইন মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নকলনবিশ গিয়াস উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ করে আসছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, তিনি প্রায়ই অফিসে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করেন, যার ফলে দাপ্তরিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক দলিল করান।
সামগ্রিকভাবে, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীসহ সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমি নিজে গুলশান অফিসের নকলনবিশ গিয়াস উদ্দিনের বিষয়ে নানাভাবে হিমশিম খাচ্ছি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই অসহায়। এসব দায়-দায়িত্ব কেউ গ্রহণ করে না, বাধ্য হয়ে গিয়াস উদ্দিনের ওপর দেওয়া হয়েছে। অফিসের সহকারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সে নিজের ইচ্ছায় স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে। উপায় না পেয়ে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গিয়াস উদ্দিনের ওপরই দায়-দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
কেকে/এলএ