মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিশ্বনেতাদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর       কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে না পড়ে : সমাজকল্যাণমন্ত্রী      রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে অংশীজনদের ক্ষোভ
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৯:৪০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে এ প্রস্তাবকে অযৌক্তিক ও জনস্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, শিল্প উদ্যোক্তা, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার অংশীজন।

বুধবার রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত গণশুনানিতে পিডিবি এ প্রস্তাব উপস্থাপন করে। শুনানিতে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদসহ অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমান দাম ও প্রস্তাবিত বৃদ্ধি

বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর রয়েছে। পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, এই দর ২১ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়লে নতুন দাম হবে ৮ টাকা ২৪ পয়সা এবং ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়লে তা দাঁড়াবে ৮ টাকা ৫৪ পয়সায়। 

পিডিবির ভাষ্য, এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলেও পুরো ঘাটতি পূরণ হবে না; কিন্তু সরকারের ভর্তুকির চাপ আংশিকভাবে কমবে। 

বিপুল ঘাটতির যুক্তি 

পিডিবির উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় বাবদ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। বিদ্যমান পাইকারি ট্যারিফে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে সম্ভাব্য আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় সরবরাহ ব্যয় দাঁড়ায় ১২ টাকা ৯১ পয়সা। এ হারে মূল্য নির্ধারণ করা হলে পিডিবির কোনো ঘাটতি থাকবে না বলে দাবি করা হয়েছে। 

পিডিবি জানায়, প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ঘাটতি কমবে ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। আর ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ালে ঘাটতি কমবে ১৬ হাজার ৬২৩ কোটি টাকার বেশি।

ভর্তুকি ছাড়া দাম বাড়াতে হতে পারে ৭৭ শতাংশ 

বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ভর্তুকি বাদ দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির নিট রাজস্ব চাহিদা প্রতি ইউনিটে ১২ টাকা ৫১ পয়সা। বর্তমান পাইকারি দরে প্রতি ইউনিটে ঘাটতি রয়েছে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। এই ঘাটতি পুরোপুরি দূর করতে হলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রায় ৭৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়াতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে কমিটি বলেছে, মূল্যবৃদ্ধি হবে কি না এবং কতটা হবে, তা মূলত সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। 

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেছেন, আমরা যে মূল্য হারের পরিবর্তনের কথা বলছি, তা পুরোপুরি ব্রেক-ইভেনে যাওয়ার জন্য নয়। প্রস্তাব অনুযায়ী মোট ঘাটতির একটি অংশ সমন্বয় করা যেতে পারে। বাকি অংশ সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল নিয়ামক ফুয়েলগুলো হচ্ছে গ্যাস, কয়লা ও লিকুইড ফুয়েল। বর্তমানে এইচএফও (ভারী জ্বালানি তেল) ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ডিজেল পাওয়ার প্লান্ট এই মুহূর্তে চালানো হচ্ছে না।

রেজাউল করিম বলেন, এসব ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা যে কোম্পানিগুলো থেকে বিদ্যুৎ নিই, নিজস্ব এবং সরকারি-বেসরকারি, সেগুলোর ফুয়েলের মূল্য অনেক ক্ষেত্রে ডলারে এবং অনেক ক্ষেত্রে টাকায় পরিশোধ করতে হয়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ফুয়েলের দাম বৃদ্ধি— এই দুই মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। 

পিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ ইম্পোর্ট করি, এমন বক্তব্য সঠিক নয়। আমরা প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি করি। বাকি অংশ দেশীয় উৎপাদন হলেও এর বড় অংশই আমদানিকৃত জ্বালানিনির্ভর।

তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য এমন নয় যে, ট্যারিফ বাড়িয়ে ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হবে। আমরা একটা ভারসাম্য আনতে চাই। একটি সরকারের জন্য প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া বড় বিষয়। তাই খাতে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রয়োজন। এজন্যই এ প্রস্তাবনা আনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা এমন কোনো মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব করছি না, যাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে বা পুরো খাতকে ব্রেক-ইভেনে নেওয়া হয়। বরং একটা ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে একটা কথা বারবার বলা হচ্ছে, দাম না বাড়ালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। সবাই শুধু সরকারের মুনাফা নিয়েই ভাবছে, অথচ মানুষ যে মরে যাবে তার কোনো খেয়াল নেই।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। অথচ বিইআরসি কোনো পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে গেল না। আপনারা বলেন, আইন অনুযায়ী ক্ষমতা নেই। যেখানে সংবিধান পরিবর্তনের মতো কথা উঠতে পারে, সেখানে বিইআরসি আইন পরিবর্তন কেন সম্ভব হবে না? আপনারা মানুষের পক্ষ না নিয়ে যারা অবৈধভাবে এসব প্রস্তাব দিচ্ছে, তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। আপনাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এখান থেকে সরে আসুন। সরে না এলে আপনারা এক সময় গণশত্রুতে পরিণত হবেন।

ক্যাবের অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বলেন, প্রয়োজনে ভর্তুকি দিতে হবে। তাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না।
 
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘এই গণশুনানি এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবার শুনানি হয়, তারপর দাম বাড়ানো হয়। এটি কার্যত লোক দেখানো প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।’ তিনি বিইআরসি আইন সংশোধন করে নতুন কাঠামোর অধীনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।

মুঠো ফোন অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মহিউদ্দিন বলেন, আমরা মনে করেছিলাম, নতুন সরকার আসার পর বিদ্যুতের দাম কমানো হবে। কিন্তু এখন উল্টো বাড়ানো হচ্ছে। 

ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর নেতা জালালউদ্দিন বলেন, রপ্তানি খাত এমনিতেই চাপে রয়েছে। এসময় বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, উচ্চ সুদহার, গ্যাস সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমে যাবে।

গণশুনানিতে জানানো হয়, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির চাহিদা করা হয়েছে। এতে মোট ভর্তুকি ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। পিডিবির মতে, প্রস্তাবিত মূল্য সমন্বয় কার্যকর হলে এই ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমবে, তবে সরকারকে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হবে।
খুচরা দামও বাড়ার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লে পরে বিতরণ কোম্পানিগুলো খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আবেদন করতে পারে। ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল বাড়বে এবং এর প্রভাব নিত্যপণ্যের দামেও পড়বে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘সব পক্ষের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন ও উপস্থাপিত যুক্তি পর্যালোচনা করে কমিশন পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।’

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিদ্যুত   মূল্যবৃদ্ধি   অংশীজন   ক্ষোভ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close