ঢাকা, একসময় যাকে স্বপ্নের শহর বলা হতো, আজ তা পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী যানজটের নগরীতে। মাত্র কয়েক বছর আগেও ঢাকায় গাড়ি ছুটত ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার গতিতে। আজ সেই গতি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে, যা হাঁটার গতির চেয়েও কম। প্রতিদিন ৮২ লাখেরও বেশি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে যানজটে, প্রতি বছর অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে পাঁচ লাখ কোটি টাকারও বেশি। স্বপ্নের ঢাকা যে আজ দমবন্ধ করা যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে, সেটা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
ঢাকার ট্রাফিক বিপর্যয় : পুরোনো চিন্তায় সমাধান নয়, চাই স্মার্ট সিগন্যাল বিপ্লব
প্রধানমন্ত্রী ঢাকার যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণে যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ফুটপাথ ও রাস্তার কিছু অংশ হকারমুক্ত করা, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা, লেন শৃঙ্খলা বজায় রাখা যদিও ঢাকায় রোড মার্কিং অত্যন্ত অপ্রতুল তথাপি এসব উদ্যোগ ট্রাফিক চলাচলে দৃঢ়তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে আসবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ঢাকা মহানগরীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ কোনো নগরীতে টেকসই ও যানজটমুক্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু আইন মেনে চলার চর্চাই যথেষ্ট নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য উপাদান হলো আধুনিক কার্যকরী ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা।
গত পাঁচ দশকে ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে সর্বসাকুল্যে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। একটি বিশাল নগরীর প্রেক্ষাপটে এটি নিতান্তই নগণ্য অঙ্ক, তেমনি এই নগরীতে ট্রাফিক সিগন্যালের সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য। অসংখ্য সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে, তবে কাক্সিক্ষত সাফল্য ধরা দেয়নি। বহু মোড়ে সিগন্যাল নেই, যেগুলো আছে সেগুলো অকেজো, সমন্বয়হীন, কিংবা প্রাচীন প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে সারা শহর জুড়ে দেখা যায় যান্ত্রিক অচলাবস্থা। তাহলে কি কোনো সমাধান নেই? অবশ্যই আছে।
যেখানে শুরু হয়েছিল সূচনা, সেখানেই আটকে আছে অগ্রগতি
১৯৬০ সালে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের বিহারি লালজি মন্দিরের কাছে প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসে। সেই বাতির সুইচ চালাতেন এক ট্রাফিক পুলিশ খালি চোখে তিন দিক দেখে। ১৯৭৭ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি জিইসি প্রথম অটোমেটিক সিগন্যাল স্থাপন করে। আশির দশকের শেষ দিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠান মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড টাইমার সার্কিট দ্বারা পরিচালিত ফিক্সড-টাইম কন্ট্রোল সিস্টেমের প্রচলন ঘটায় এটি যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভাবিত ১৯২২ সালের প্রযুক্তি। পরবর্তী মাইক্রো ওমরণ প্রোগ্রামএবেল লজিক কন্ট্রোলার সিগন্যাল কন্ট্রোলার হিসাবে ব্যবহার করে। জিইসি ও মাইক্রো হ্যালোজেন ল্যাম্প দিয়ে সিগন্যাল বাতি তৈরি করত, যার আলোর তীব্রতা ও স্থায়িত্বকাল ছিল খুবই কম।
শতকোটি টাকা ব্যয়ে বারবার ব্যর্থতা
২০০১-২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (ডিইউটিপি) আওতায় ৬৯টি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনে ব্যয় হয় প্রায় ১৩ কোটি টাকা। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান টাইকো উন্নতমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করলেও তাদের স্থানীয় এজেন্টের অজ্ঞতা ও চাতুরির কারণে কোনো অ্যাডাপ কন্ট্রোল সিস্টেম চালু করা হয়নি। চারটি সিগন্যাল একেবারেই চালু করা হয়নি। তবে প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম এলইডি ল্যাম্প স্থাপন করা হয় কাজ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্য বেঙ্গল কনস্ট্রাকশন এসব অচল সিগন্যাল চালু করে।
২০০৩ সালে দ্য বেঙ্গল কনস্ট্রাকশন মিরপুর করিডোরে সিমেন্স পিএলসি-নির্ভর প্রথম টিওডি (টাইম অব ডে) ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম চালু করে। টিওডি এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, যেখানে দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সিগন্যাল তার পূর্বনির্ধারিত সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজেই পরিবর্তন করতে সক্ষম। ২০১৩ সালে সেই ধারাবাহিকতায় আরও ৭০টি মোড়ে সোলার প্যানেল ও টাইমার কাউন্টডাউন যুক্ত করে পুনরায় আধুনিকায়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়। এ কাজ সম্পন্ন করে রহিম আফরোজ-সিএমএস (ভারত) ও দ্য বেঙ্গল কনস্ট্রাকশন।
ঢাকায় প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক সিগন্যালের অভিজ্ঞতা কিন্তু পাঁচ দশকের নয়; বরং অন্তত দুই দশক। দুঃখজনকভাবে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দীর্ঘ সময় ধরে এই শহরের সিগন্যালসমূহের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বন্ধ রাখে। ফলে ধীরে ধীরে স্থাপিত সিগন্যালগুলো অচল হয়ে পড়ে এবং প্রশাসন বাধ্য হয় পুরোনো ম্যানুয়াল ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করতে, যা আধুনিক নগরীর জন্য এক অবমাননাকর ও অদক্ষ পদ্ধতি।
এখানে আরেকটি তিক্ত সত্যও স্পষ্ট করে বলা দরকার
অদ্যাবধি এ শহরে কখনোই আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির অ্যাডাপটিভ সিগন্যাল কন্ট্রোল কার্যকরভাবে পরীক্ষাই করা হয়নি। ২০২০ সালে জাইকার অর্থায়নে একটি জাপানি কোম্পানি ঢাকায় এআই ভিত্তিক ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রকল্পটি সফলতার মুখ দেখেনি; বরং ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এই ব্যর্থতা আমাদের স্থানীয় বিশেষজ্ঞ মহলের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক ধারণার জন্ম দেয়। অনেক বিশেষজ্ঞই সহজে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে, ‘এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তি ঢাকা শহরে কখনোই সফল হবে না, কারণ আমাদের বিদ্যমান সড়ক কাঠামো, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের প্রবাহ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই প্রযুক্তির জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।’
একটি ব্যর্থ প্রকল্প পুরো প্রযুক্তিকে ব্যর্থ প্রমাণ করে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, প্রযুক্তি নির্বাচন, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় কোথায় দুর্বলতা ছিল? এবং এআইভিত্তিক অ্যাডপটিভ ট্রাফিক কন্ট্রোল প্রযুক্তিতে জাপানি প্রযুক্তিই যে শেষ কথা নয়। দুঃখজনকভাবে, আমাদের বিশেষজ্ঞরা এ সত্যটি যাচাই করার বা নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের প্রয়াসটুকু পর্যন্তও দেখাননি।
তারপরও ইতিহাস বারবার নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। ২০২২ সালে ডিএনসিসির সাবেক মেয়রের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে দাহুয়া নামের একটি চীনা ভিডিও সার্ভিল্যান্স প্রতিষ্ঠান গুলশান-২-এ তথাকথিত ‘এআই-ভিত্তিক’ ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করে। কিন্তু সেটি ছিল মূলত ট্রাফিক লঙ্ঘন শনাক্তকরণের ব্যবস্থা, সেটি কোনো ডিসেন্ট্রালাইজড অ্যাডাপটিভ কন্ট্রোল সিস্টেম নয়। তা সত্ত্বেও দেশের বিশেষজ্ঞ মহলে ছড়িয়ে পড়ে ভ্রান্ত ধারণা ‘এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল’ মানেই ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা ও জরিমানা করা। বস্তুত এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম প্রযুক্তিতে ‘ট্রাফিক ভায়লেসন ডিটেকশন’ বা ট্রাফিক আইন প্রয়োগ যন্ত্রাংশ একটি সহায়ক বা অক্সিলিয়ারি কম্পোনেন্ট হিসাবে সংযুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালে ট্রাফিক্স নামক দেশীয় কোম্পানি আরেকটি ফিক্সড টাইম কন্ট্রোল সিস্টেম গুলশান ১-এ স্থাপন করে এবং এটিও দাহুয়া এর ন্যায় অ্যাডাপটিভ কন্ট্রোল সিস্টেমের চেয়ে ট্রাফিক ভায়লেসন ডিটেকশন কর্মে অধিক মাত্রায় ক্রিয়াশীল ও যত্নশীল।
১৮৬৮ সালে ট্রাফিক কন্ট্রোলের যাত্রা শুরু। তারপর থেকে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার বিবর্তন চারটি প্রজন্মে বিভক্ত।
প্রথম প্রজন্ম (১৯২০-৪০) : এটি ছিল ফিক্সড-টাইম, যেখানে সারাদিন একই টাইমিং প্ল্যান চলে। ফলে ফাঁকা রাস্তায় লাল বাতিতে অহেতুক থামতে হয়, এবং পাশের মোড়ের সঙ্গে কোনো সমন্বয় থাকত না। এটি রিয়েল টাইম ট্রাফিক বুঝতে পারে না, যানজট ও বায়ুদূষণ বাড়ায়।
দ্বিতীয় প্রজন্ম (১৯৪০-৭০) : অ্যাকচুয়েটেড কন্ট্রোল। এতে সেন্সরের মাধ্যমে গাড়ির সংখ্যা শনাক্ত করে সবুজ সময় কিছুটা বাড়ানো কমানো যেত। কিন্তু এটি ছিল শুধু একটি মোড়কেন্দ্রিক সীমিত ব্যবস্থা, পুরো শহরের জন্য যথেষ্ট নয়।
তৃতীয় প্রজন্ম (১৯৭০-২০১০) : সেন্ট্রালাইজড অ্যাডাপটিভ কন্ট্রোল। এতে কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার সব মোড়ের টাইমিং নিয়ন্ত্রণ করে। তবে কেন্দ্রীয় সার্ভারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ধীরগতি, দুর্ঘটনায় দ্রুত অভিযোজনের অক্ষমতা এবং জরুরি গাড়ি অগ্রাধিকার দিতে সমস্যার সীমাবদ্ধতা ছিল।
চতুর্থ প্রজন্ম (২০১০-বর্তমান) : এআই-চালিত বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা।
দেশীয় কিছু বিশেষজ্ঞ মহলে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত হয়েছে যে, ‘এআই সব সমস্যার সমাধান বা প্যানাসিয়া (সর্বব্যাধিহর ঔষধ) নয়।’ বাস্তবতা হলো, এআই অবশ্যই কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে শতবর্ষ পুরোনো, বহু আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ ফিক্সড-টাইম ট্রাফিক কন্ট্রোল প্রযুক্তিও আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে না।
আরও একটি প্রচলিত বক্তব্য হলো, ‘এআই ব্যবহারের আগে কিছু পূর্বশর্ত পূরণ করতে হয়; যেমন মানবশৃঙ্খলা, নির্দিষ্ট ধরনের যানবাহন এবং পথচারীদের সুশৃঙ্খল চলাচল। ঢাকা শহরে মোটরসাইকেলসহ ২২ ধরনের যানবাহন চলে, রাস্তার জায়গাগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাই এখানে এআই বাস্তবায়ন কঠিন।’ প্রশ্ন হলো, এই তথাকথিত ‘পূর্বশর্ত’ আদৌ কোথা থেকে এসেছে? কারণ বাস্তব বিশ্বের সফল উদাহরণগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরে।
বাস্তব সত্য হচ্ছে, সুরট্রাক এবং এর মতো এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি ঢাকার মতো জটিল, মিশ্র ও অপ্রত্যাশিত ট্রাফিক ব্যবস্থার জন্যই বিশেষভাবে উপযোগী। ২০১২ সালে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে উদ্ভাবিত এই সিস্টেমটি বিশ্বের প্রথম বিকেন্দ্রীভূত অ্যাডাপটিভ ট্রাফিক কন্ট্রোল প্রযুক্তিগুলোর একটি। এটি কেন্দ্রীয়ভাবে ধীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি ইন্টারসেকশনে স্থানীয়ভাবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং পাশের সিগন্যালগুলোর সাথে সমন্বিতভাবে ‘কথা বলে’ কাজ করে, যাতে যানবাহন বারবার থেমে না গিয়ে ধারাবাহিকভাবে একটানা চলতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রয়োগে এটি গড় ভ্রমণ সময় ২৫ শতাংশ, অপেক্ষার সময় ৪০ শতাংশ এবং নির্গমন ২০ শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই প্রযুক্তি নিখুঁত লেন শৃঙ্খলা বা একধরনের যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইন্টারসেকশনে রিয়েল-টাইমে শুধু ২২ ধরনের যানবাহনই নয়, যে ধরনের যানই আসুক, গাড়ি, বাস, ট্রাক, রিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল কিংবা পথচারী, সবকিছুর গতিবিধি বিশ্লেষণ করে এটি তাৎক্ষণিকভাবে সিগন্যালের সময়সূচি নির্ধারণ করতে সক্ষম। প্রতি সেকেন্ডে এটি নিজের টাইমিং প্ল্যান ও ফেজ প্যাটার্ন পুনঃসমন্বয় করে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। এর ফলে একটি মোড়ে সৃষ্টি হওয়া চাপ পাশের মোড়গুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়; এমনকি স্পিলব্যাক বা জটিল জ্যাম পরিস্থিতিতেও এটি কার্যকরভাবে ট্রাফিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। এ ছাড়া এ প্রযুক্তি ভবিষ্যদ্বাণী (প্রেডিকশন) করতে পারে, জরুরি যানবাহনকে অগ্রাধিকার দিতে পারে এবং সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। একইসঙ্গে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তকরণ ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত কার্যকর। ঢাকার মতো শহরের জন্য, যেখানে ট্রাফিক প্রবাহ মিশ্র, অনিয়মিত এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, সেখানে এমন বিকেন্দ্রীভূত অ্যাডাপটিভ প্রযুক্তিই হতে পারে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান।
দেশীয় বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আমরা আগে মানুষকে ট্রাফিক সিগন্যাল মানতে অভ্যস্ত করতে চাই। মানুষ যখন সিগন্যাল মানবে এবং যানবাহনের সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা আসবে, তখন ধীরে ধীরে আরও উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই ‘অভ্যস্ত করার’ প্রক্রিয়া আর কতদিন চলবে? বাংলাদেশে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়েছে ১৯৭৭ সাল থেকে। প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও যদি একই যুক্তি চলতে থাকে, সিগন্যাল মানতে অভ্যস্ত করা কার্যক্রম চলতে থাকে, তাহলে সমাধান আসবে কখন? বিশ্ব যখন এআই-নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ঢাকা এখনো পুরোনো ফিক্সড-টাইম সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আটকে আছে। সমস্যাটি প্রযুক্তির নয়; মূল সমস্যা হলো সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং পরিবর্তন গ্রহণের মানসিকতা।
কিন্তু ঢাকা এখনো কোন প্রজন্মে দাঁড়িয়ে?
বাস্তবতা হলো, ঢাকা এখনো মূলত প্রথম প্রজন্মের প্রযুক্তির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো কার্যকর ও বুদ্ধিমান ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। আর সেখানেই ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকার যানজট নিরসনে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের ডাকলে, বুয়েট ১৯২২ সালের ফিক্সড-টাইম সিগন্যাল প্রযুক্তি কপি করে নিজেরাই পরামর্শক, দর নির্ধারক, মাননিয়ন্ত্রক, প্রস্তুতকারক ও ঠিকাদার সব ভূমিকায় এককভাবে অবতীর্ণ হয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিডিং ছাড়াই কাজটি নিয়ে নেয়, অথচ জনসাধারণের জানামতে, বুয়েট বা এর বিশেষজ্ঞদের ঢাকা শহর বা বিশ্বের অন্য কোনো শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন, ডিজাইন, ব্যবস্থাপনা বা কনসালটেন্সি কাজের পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। অথচ আন্তর্জাতিক বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয় (সিএমইউ) সুরট্রাক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও ঠিকাদারির দায়িত্ব নিজে নেয়নি; বরং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এ দেশে বুয়েট ব্যতিক্রমী পথে হেঁটেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক ভূমিকার চেয়ে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে বেশি জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
আরও উদ্বেগজনক, এই নগরীর ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে আসা অভিজ্ঞ কনসালট্যান্ট ও প্রকৌশলীদের এ কাজে একবারও ডাকা হয়নি, ফলে প্রকল্পটির স্বচ্ছতা, কারিগরি নির্ভুলতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রকল্পটির বাস্তব চিত্র অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, দেড় বছরে বুয়েট ২২টি মোড়ের স্থলে মাত্র ৭টি মোড়ে কাজ শেষ করতে পেরেছে, এবং যে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছে তা শতবর্ষ পুরনো ফিক্সড-টাইম কন্ট্রোল সিস্টেম, যা বিশ্বের ব্যস্ত নগরীতে বর্তমানে অচল।
বুয়েট, যুক্তরাষ্ট্রের ১৯২২ সালের ফিক্সড-টাইম পদ্ধতি অনুসরণ করলেও তারা একে ‘দেশীয়’ বলছে। তাদের প্রস্তুতকৃত সিগন্যাল কন্ট্রোলারে আন্তর্জাতিক মান (EN 12675, NEMA TS2, IP65, ISO 10711, ISO 26684) I NTCIP’-এর মতো স্ট্যান্ডার্ড কমুনিকেসন প্রোটকল অনুপস্থিত, যা ভবিষ্যতে আপডেটকরণ, আপগ্রেডেশন ও ইন্টিগ্রেশন এক অর্থে অসম্ভব করে তুলবে। এছাড়া এসব আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে যে, বুয়েট ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ঐসব কন্ট্রোলার নিয়ে কাজ করতে পারবে না; যাকে বাণিজ্যিক পরিভাষায় ‘একচেটিয়া’ (মনোপলি) বলা হয়।
এছাড়া আরও দেখা যায় প্রতিটি মোড়ে আলাদা কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে যেখানে বসে অপারেটররা সিসিটিভি দেখে ম্যানুয়ালি সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করে, ১৯১৫ সালে আমেরিকার ডেট্রয়েট শহরে ট্রাফিক পুলিশ টাওয়ারে বসে এই পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করত, কার্যত বুয়েট তাই অনুসরণ করেছে মাত্র। এই ম্যানুয়াল ওভাররাইড পদ্ধতি সম্পূর্ণ অদক্ষ, এতে জনবল অনেক বেশি লাগে, জটিল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে ‘দি বেঙ্গল কনস্ট্রাকশন’ মিরপুর করিডোরে সহজ পুশ-সুইচভিত্তিক এই ম্যানুয়াল ওভাররাইড পদ্ধতি চালু করলেও তা প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি।
আউটডোরে স্থাপিত যে কোনো ল্যাম্পের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান আইপি৬৫ অনুসরণ করা একটি আবশ্যিক শর্ত। অথচ বুয়েট ও ট্রাফিক্স কোম্পানির তৈরি এলইডি ট্রাফিক ল্যাম্পগুলোতে এই মান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে এসব ল্যাম্প দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে এবং ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন হবে। বিপরীতে, ২০০৩-০৪ সালে সরবরাহকৃত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এলইডি ট্রাফিক ল্যাম্পগুলো আজও প্রায় মেরামত ছাড়াই কার্যকর ও নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকর রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকা মহানগরীর ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে অটোমেটেড ও প্রোগ্রেসিভ ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বুয়েটকে পুনরায় কোনো যাচাই-বাছাই বা টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই দর নির্ধারণ, স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ, মান নিয়ন্ত্রণ, ম্যানুফ্যাকচারিং ও ঠিকাদারির কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, আর এতে করে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের সুযোগ আবারো হাতছাড়া হচ্ছে। যদিও বুয়েট এবার প্রোগ্রেসিভ ট্রাফিক সিগন্যাল বা ‘গ্রিন ওয়েভ’ পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছে (যা ১৯৩০’-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চালু হয় এবং নির্দিষ্ট গতিতে চলা যানবাহনকে থামাবিহীন সবুজ সংকেত দেয়), তবে বুয়েট যে ফিক্সড-টাইম ও ম্যানুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করছে তাতে শুধু মূল করিডোরে কিছু সুবিধা এলেও পার্শ্ববর্তী সড়কে তীব্র যানজট ছড়িয়ে পড়বে, ঠিক যেমনটি ২০০২-০৩ সালে ‘দ্য বেঙ্গল কনস্ট্রাকশন’ মিরপুর করিডোরে চালু করেও আশানুরূপ ফল পায়নি। প্রকৃত গ্রিন ওয়েভ সফল করতে প্রয়োজন উন্নত অ্যালগরিদম এবং তা যদি হয় এআই-চালিত, তবেই তা সর্বোৎকৃষ্ট হতে পারে; কিন্তু একই পুরোনো ফিক্সড-টাইম ও ম্যানুয়াল কাঠামোতে আবারও ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হবে।
আজ বিশ্বের বহু যানজটপূর্ণ মহানগরী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত অভিযোজিত ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ধীরে ধীরে যানজটমুক্ত ও গতিশীল নগরীতে পরিণত হচ্ছে; এমনকি প্রতিবেশী দেশের শহরগুলোও ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তির সুফল ভোগ করছে। অথচ ঢাকা এখনও মূলত ১৯১৫ ও ১৯২২ সালের শতবর্ষ পুরোনো ফিক্সড-টাইম কন্ট্রোল প্রযুক্তি নিয়েই ব্যস্ত। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে ‘আধুনিকীকরণ’, ‘দেশীয় প্রযুক্তি’, ‘অটোমেশন’ কিংবা ‘প্রোগ্রেসিভ ট্রাফিক সিগন্যাল’, এসব আকর্ষণীয় শব্দের আড়ালে যদি আবারও প্রাচীন বিদেশি অচল ফিক্সড-টাইম ও ম্যানুয়াল কন্ট্রোল সিস্টেমকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, কিংবা এআই ট্রাফিক সিস্টেমের নামে শুধু ট্রাফিক আইন অমান্য শনাক্তকরণ ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে, তবে তা প্রকৃত সমাধান নয়।
বাস্তব সমাধান হলো এমন এআই চালিত বিকেন্দ্রীভূত অ্যাডাপ্টিভ ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা, যা পুরো নগরীর ট্রাফিক প্রবাহকে গতিশীল রাখতে সক্ষম। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কনসালট্যান্টদের পাশাপাশি বাংলাদেশের ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন কাজ করা অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরামর্শকদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে এবং প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে এআই-ভিত্তিক অ্যাডাপ্টিভ ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর উপযোগিতা ও কর্মক্ষমতা যাচাই করা যেতে পারে।
প্রশ্ন একটাই, ঢাকা কি আরও বহু বছর যানজটে স্থবির হয়ে থাকবে, নাকি আধুনিক প্রযুক্তির সাহসী প্রয়োগের মাধ্যমে একটি গতিশীল ও ভবিষ্যতমুখী নগরীতে পরিণত হবে?
কেকে/এমএ