গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় গবাদিপশুর মধ্যে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) বা লাম্পি রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গরুর শরীরে গুটি, জ্বর, ফোলা ও ঘা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এতে খামারি ও কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আক্রান্ত গরুর শরীরে প্রথমে জ্বর দেখা দেয়। পরে শরীরজুড়ে ছোট-বড় গুটি ও ফোলা সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব গুটি পেকে ঘায়ের আকার ধারণ করছে। কোথাও কোথাও ক্ষতস্থান পচে গিয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করছে। ফলে পশুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে, খাদ্যগ্রহণ কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।
টোক ইউনিয়নের বড়চালা গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান জানিয়েছেন, তার সাত মাস বয়সী একটি ষাঁড় বাছুর লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এতে তিনি উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
একই গ্রামের কৃষক শামসুল হক বলেছেন, “আমার পাঁচ মাস বয়সী একটি বকনা বাছুর এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসার জন্য প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করেছি। কিন্তু এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।”
বারিষাব ইউনিয়নের লোহাদী গ্রামের কৃষক আতিকুর রহমান বলেছেন, “আমার তিনটি গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসা করাতে প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তারপরও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।”
সিংহশী ইউনিয়নের কপালেশ্বর গ্রামের খামারি ওয়াজকুরুনি জানিয়েছেন, “আমার তিনটি গরুর শরীরে গুটি ও ফোলা দেখা দেয়। পরে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করি। গত পাঁচ দিন ধরে চিকিৎসা চলছে।”
রায়েদ ইউনিয়নের কৃষক রুবেল প্রধান জানিয়েছেন, “আমার খামারে ছয়টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে একটি গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়ে গতকাল মারা গেছে।”
টোক ইউনিয়নের কেন্দুয়াব গ্রামের কৃষক আক্তার আলী আকন্দ জানিয়েছেন, “আমার একটি বকনা বাছুর আক্রান্ত হয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসা চলছে। আমাদের গ্রামের অন্তত ১০ জন কৃষকের গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে।”
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় একই খামারের একাধিক গরু আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু প্রস্তুত করা খামারিদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রোগের কারণে পশুর বাজারমূল্য কমে যেতে পারে এবং প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
স্থানীয় পশু চিকিৎসক জয়নাল আবেদীন বলেছেন, “লাম্পি স্কিন ডিজিজ একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। সাধারণত মশা, মাছি ও অন্যান্য রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। আক্রান্ত গরুর জ্বর, শরীরে গুটি, চামড়ায় ক্ষত ও ফোলা দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা ও পরিচর্যা না করলে জটিলতা বাড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখতে হবে, খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং মশা-মাছি দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।”
এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আতিকুর রহমান বলেছেন, “লাম্পি স্কিন ডিজিজ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিছু গরু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা ও খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। খামারিদের আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা নিকটস্থ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “গবাদিপশুকে নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনতে হবে, খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে। আক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা রাখলে রোগের বিস্তার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রাণিসম্পদ বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।”
উপজেলার খামারি ও কৃষকরা রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে লাম্পি স্কিন রোগ আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে গবাদিপশু খাতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রোগটির বিস্তার খামারিদের জন্য নতুন শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেকে/এজে