দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে আগামী ২৮ মে। শুরু হয়েছে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি। ২৫ মে থেকে সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে এরই মধ্যে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীতে আসতে শুরু করেছে কোরবানির পশুবোঝাই গাড়ি। পাশাপাশি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, মহাসড়ক ও পশুর হাটে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি; মাঠে সক্রিয় পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি।
সাধারণত ঈদ বা যে কোনো জাতীয় উৎসব এলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রতারক চক্র। ঈদুল আজহা ঘিরে এবারও ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, টিকিট কালোবাজারি ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এসব অপরাধ দমনে সক্রিয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পশুবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ঘরমুখো মানুষের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিতে রাজধানীসহ সারা দেশের নিরাপত্তায় সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
ঈদ ঘিরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও নৌপুলিশ এরই মধ্যে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, মহাসড়ক, টোলপ্লাজা ও রাজধানীর প্রবেশমুখে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, চেকপোস্ট, সিসিটিভি মনিটরিং ও বিশেষ টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে ঈদ উদযাপনে একগুচ্ছ পরামর্শ দিচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। তথ্য বলছে, ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের যে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-সহ হেডকোয়ার্টার্সের কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ নম্বরের মাধ্যমে র্যাব, পুলিশের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিতে পারবেন। এ ছাড়া বেশ কিছু নির্দেশনাও মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
ঈদ ঘিরে দেশবাসীর নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিতে শুধু র্যাব বা পুলিশ নয়, মাঠে নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এরই মধ্যে রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টোল প্লাজা, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার টোল প্লাজা এবং পদ্মা সেতু টোল প্লাজায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য বলছে, ঢাকা সিটিতে ডিএমপি নিয়ন্ত্রণাধীন ২ হাজারের বেশি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং চলবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঢাকা মহানগরেই অতিরিক্ত ৭ হাজার পুলিশ সদস্য ডিউটিতে নিয়োজিত থাকবেন।
ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত যে ডিউটি থাকে, সেটার পাশাপাশি ঈদুল আজহা কেন্দ্র করে আরও কয়েকটি বিষয় মাথায় নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘পশুর হাট, ঈদের জামাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান-মার্কেটের নিরাপত্তা এবং ঘরমুখো মানুষ যখন রাজধানী ছেড়ে চলে যাবে, তখন তাদের আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং ঈদযাত্রায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা— এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমাদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে ছিনতাই, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা প্রতিরোধে সাদা পোশাকে পুলিশ থাকবে। সার্বক্ষণিক সিসিটিভির মাধ্যমে মনিটরিং চলবে।’
এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘মোটামুটি ঢাকা শহরের ম্যাক্সিমাম এরিয়া আমাদের সিসিটিভির আওতায় থাকবে। পশুর ক্রেতা-বিক্রেতারা যেন হাটে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন, সেখানেও আমাদের সদস্য মোতায়েন থাকবে। পশুবাহী যানবাহনকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি প্রতিরোধে আমাদের বিশেষ অভিযান পরিচালিত হবে। এরই মধ্যে গত ১ মে থেকে এই অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘরমুখো মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাটকেন্দ্রিক আমাদের কন্ট্রোল রুম থাকবে। ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি প্রতিরোধে আমাদের টহল টিম থাকবে, সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।’
এ ছাড়া নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা থাকবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ঢাকার এক্সিট-এন্ট্রি পয়েন্টগুলোতে তারা চেকপোস্ট পরিচালনা করবেন বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ঢাকা সিটিতে ২ হাজারের বেশি সিসি ক্যামেরা আছে। সেগুলোর মাধ্যমে আমরা ঢাকা সিটির গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো মনিটর করব। কোথাও কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি লক্ষ করলে সেখানে দ্রুত রেসপন্স করব। গরুর হাটগুলোতে অধিক পরিমাণ লেনদেনের ক্ষেত্রে আমাদের মানি এসকর্ট টিম থাকবে। যদি কেউ বেশি পরিমাণ টাকা পরিবহন করেন, সেক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য চাইলে আমরা তাদের সাহায্য করব। অধিক টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে আমাদের কন্ট্রোল রুম বা ৯৯৯-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করলে আমাদের টিম রেসপন্স করবে।’
ঈদকেন্দ্রিক রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত ৭ হাজার পুলিশ সদস্য ডিউটিতে নিয়োজিত থাকবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে পশুর হাটকেন্দ্রিক ২ হাজার ৪৮৯ জন। এই ডিউটি চলবে ২৮ মে পর্যন্ত। এরপর ঈদ জামাত এবং ঈদপরবর্তী আলাদা রোস্টার (শিডিউল) তৈরি করা হবে। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের ডেপ্লয়মেন্ট আলাদা হবে। বর্তমানে ডিএমপিতে ৩২ হাজারের কিছু বেশি সদস্য আছেন। এ ৩২ হাজার পুলিশ সদস্য থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ছুটিতে যেতে পারবেন।’
ভোগান্তিহীন ঈদযাত্রা ও নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকা শহরসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হবে। আগের ঈদগুলোতে কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করেই এবারের ঈদনির্ভর কার্যক্রম ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এ বাড়তি চেকপোস্টের পাশাপাশি আমাদের অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা থাকছে। এভাবে সব পরিকল্পনা মাথায় রেখে কার্যক্রম সাজানো হচ্ছে, যেন ঈদের সময় কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম না থাকে। ছিনতাই-রাহাজানির এই কাজগুলো যে কোনো সময় হয়। সেই সময় নির্ধারণ করে আমাদের টহল কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় কন্ট্রোল রুম স্থাপনের মাধ্যমে র্যাব সদস্যদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন ও সাধারণ মানুষের যে কোনো অভিযোগ গুরুত্বসহকারে প্রতিকারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে গাবতলী, সায়েদাবাদ, রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি ঈদে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত থাকবে। এছাড়া র্যাব হেডকোয়ার্টার্সের সাইবার মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক চলমান থাকবে। মহাসড়কে পশুবাহী যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে র্যাব।’
সবাইকে সচেতন থাকার পাশাপাশি কোনো সন্দেহজনক তথ্য বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেখলে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা র্যাবকে জানানোর আহ্বানও জানান এ কর্মকর্তা।
আসন্ন ঈদুল আজহায় যানজট নিয়ন্ত্রণ ও ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ এবং নির্বিঘ্ন যাত্রার বিষয়ে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন উপলক্ষে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও জনসাধারণের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টোল প্লাজা, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার টোল প্লাজা এবং পদ্মা সেতু টোল প্লাজায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যানজট নিয়ন্ত্রণ, জনসাধারণের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজা, মহাসড়ক ও যানজটপ্রবণ এলাকায় ঈদের সাত দিন আগে থেকে শুরু করে ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।’
এদিকে গত বুধবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত মিট দ্য প্রেসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর হাট, ঈদ জামাত, শপিংমল ও আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদের ছুটিতে নগরীর নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হবে।’
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে নগদ টাকার লেনদেন কমিয়ে ব্যাংকে লেনদেন করার জন্য এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করলে পুলিশের সহযোগিতা নেওয়ার আহ্বানও জানান ডিএমপি কমিশনার।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আসন্ন ঈদ ঘিরে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, ছিনতাইকারী ও জালনোট প্রতিরোধে ডিবি এবং থানা পুলিশকে সক্রিয় করা হয়েছে। ডিএমপির প্রতিটি থানায় মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে। আমরা ঢাকার নাগরিকদের মতামত নিয়ে সর্বোত্তম পুলিশি সেবা দিতে চাই। অনেক ক্ষেত্রে জনসাধারণের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কাজ করা দুরূহ। চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সমাজের সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
একই দিন মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল আকস্মিক পরিদর্শন করেন নৌপ্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। এ সময় তিনি যাত্রীসেবা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও টার্মিনালের সার্বিক পরিস্থিতি ঘুরে দেখেন এবং টার্মিনালে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
কেকে/এলএ