দেশে কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা এখন শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। একের পর এক নির্মম ঘটনার পর জনমনে যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, তার মূল কারণ শুধু অপরাধের ভয়াবহতা নয়, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও।
বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও সে রায় বছরের পর বছর উচ্চ আদালতের আপিল, রিভিউ ও প্রশাসনিক জটিলতায় ঝুলে থাকে। ফলে বিচার যেন শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে অধরাই থেকে যায়।
পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা, মাগুরার আছিয়া কিংবা চাঁদপুরের সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর ঘটনা আমাদের বিচারব্যবস্থার এক কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে। অপরাধ সংঘটনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, গণমাধ্যমের তীব্র আলোচনা এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস শুরুতে মানুষের মধ্যে কিছুটা আশা তৈরি করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশ্বাস ফিকে হয়ে যায়। কারণ মানুষ দেখে, মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরও বছরের পর বছর দণ্ড কার্যকর হয় না। এতে ভুক্তভোগী পরিবার যেমন হতাশ হয়, তেমনি সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তাও যায় যে, ভয়ংকর অপরাধ করেও শেষ পর্যন্ত আইনের ফাঁকফোকরে সময় পার করা সম্ভব।
বাস্তবতা হলো, বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় দিলেও উচ্চ আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা পুরো বিচার প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা গেলে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হতে পারে। এতে অন্তত সমাজে একটি বার্তা যাবে যে রাষ্ট্র শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে আপসহীন।
তবে শুধু দ্রুত রায় বা দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করাই সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। সাবেক জেলা জজ যথার্থভাবেই বলেছেন, আইনের ঘাটতির চেয়ে বড় সংকট তদন্ত ও প্রয়োগে। দুর্বল তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির কারণে বহু মামলায় বিচার বিলম্বিত হয় কিংবা আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। ফলে শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না, তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন এবং বিচার বিভাগকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও সমন্বিত হতে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনায় মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে এক ধরনের হতাশা জন্ম নিচ্ছে। নিহত শিশুদের বাবা-মায়ের কান্না এখন শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি এক গভীর অনাস্থার প্রতিধ্বনি। যখন একজন বাবা বলেন, ‘খুনি জেলে বসে ভালো আছে, আর আমরা প্রতিদিন কষ্ট নিয়ে বাঁচছি’, তখন সেটি পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বেদনার ভাষা হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীর বিচার করা নয়, নাগরিকদের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং আপিল নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় প্রতিটি নতুন ঘটনা মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়াবে, আর বিচারহীনতার অন্ধকার সমাজকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে।
কেকে/ এমএস