বাংলাদেশে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর প্রায় এক দশক পার হয়ে গেছে। এই সময়ে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে বহু পরিবর্তন এসেছে। তবে বিআরআইকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। কেউ এটিকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখেছেন। একটা বড় অংশ আবার এটিকে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে-বাংলাদেশের জন্য চীনের বিনিয়োগ কি সত্যিই উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করেছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে কৌশলগত নির্ভরতার বাস্তবতা তৈরি করছে?
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর করেন। ওই সফরের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরআইয়ের অংশ হয়। সেই সময় দুই দেশের সম্পর্ককে “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ অব কোঅপারেশন”-এ উন্নীত করা হয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনার কথা ঘোষণা করা হয়। অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিনের ঘাটতিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল বড় ধরনের আশার খবর।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার-এসব প্রকল্প দেশের উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানি খাতে এসব প্রকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়াতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ এবং রেল খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব ছিল। ফলে চীনের মতো অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশের বিনিয়োগ প্রস্তাব অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিআরআইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ পেয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতিও অর্জন করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের সম্ভাবনাও বেড়েছে।
তবে বিআরআই নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। চীন বাংলাদেশে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এর সামান্য অংশ কার্যকর হয়েছে। বহু প্রকল্প ধীরগতিতে এগিয়েছে, কিছু প্রকল্প ব্যয়বৃদ্ধির কারণে পুনর্বিবেচনার মুখে পড়েছে, আবার কয়েকটি প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল হয়েছে।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাতিলের পেছনে যেমন আন্তর্জাতিক চাপ ও পরিবেশগত উদ্বেগ ছিল। একইসঙ্গে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম উচ্চগতির রেল প্রকল্প স্থগিতের পেছনে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নও কাজ করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রে চীনের প্রস্তাব নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করেনি; বরং নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
বিআরআই নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো তথাকথিত “চীনা ঋণফাঁদ”। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরকে ঘিরে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, তার পর থেকেই অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বাংলাদেশও একই পথে হাঁটতে পারে। তাদের মতে, চীনের ঋণের বোঝা একসময় বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত এমনও হতে পারে যে, কৌশলগত সম্পদের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের ঋণ কাঠামো বিশ্লেষণ করলে এই আশঙ্কা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং জাপানের কাছ থেকে এসেছে। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঋণদাতা হলেও সবচেয়ে বড় নয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত নিয়মিতভাবে ঋণ পরিশোধ করে যাচ্ছে এবং চীনের কাছে ঋণ পুনর্গঠনের কোনো আবেদনও করেনি। ফলে অন্তত বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশকে “ঋণফাঁদে” আটকে পড়া রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো অতিরঞ্জিত মনে হয়। তবে এটিও সত্য যে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এ ধরনের প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিআরআই কি শুধুই অর্থনৈতিক উদ্যোগ, নাকি এটি চীনের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ? বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অবকাঠামোকে অনেকেই চীনের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিশেষ করে কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বন্দর কিংবা অন্যান্য বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নানা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা এখানে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। ভারত, চীন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-কোনো পক্ষকেই বাংলাদেশ তার ভূখণ্ড সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিতে আগ্রহী নয়। ফলে বিআরআই-সংযুক্ত অবকাঠামো ভবিষ্যতে সরাসরি চীনের সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠবে এমন আশঙ্কা এখনো বাস্তব না। তবে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। তবে বিষয়টি এখনও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গ্রহণ করা, অন্যদিকে ভারত, জাপান, ইউরোপ ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখা-এই বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশলই এখন বাংলাদেশের প্রধান শক্তি। জাপানের মাতারবাড়ী প্রকল্প, ভারতের সঙ্গে সংযোগ উন্নয়ন কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা-সব মিলিয়ে বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েনি। বরং দেশটি প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক পরিবেশকে নিজের উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জও কম নয়। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখাও সহজ হবে না। দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক চাপও তত বাড়বে।
একটা বিষয় স্পষ্ট, বিআরআই বাংলাদেশের জন্য যেমন উন্নয়নের বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি এটি নতুন ধরনের কৌশলগত বাস্তবতারও জন্ম দিয়েছে। ফলে আমাদের সতর্ক পদক্ষেপ ফেলতে হবে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ চীনের প্রভাবাধীন কোনো নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। বরং দেশটি উন্নয়নের সুযোগ গ্রহণের পাশাপাশি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই বিআরআই বাংলাদেশের জন্য সত্যিকারের উন্নয়নের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় এটি নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের উৎসও হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লেখক: রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি অ্যান্ড পার্টনারশিপ, নেপাল
কেকে/ এমএস