গ্রামের বড়লোক মানুষ, সুন্দরী নববধূ ঘরে এনেছেন বিয়ে করে। বাসরঘরে পা দিতে গিয়ে দেখেন—দরজা বন্ধ, ভেতরে অন্য কেউ। জানালায় ধাক্কা দেন, কাচ ভাঙতে উদ্যত হন, ডাকাডাকি করেন। সেই “অন্য কেউ” জানালার ওপাশ থেকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে—দরজা খোলে না, জানালাও না। রাতে গ্রাম্য পুলিশ আসে, সব দেখে, কিছু বকশিশ পকেটে পুরে নীরবে বিদায় নেয়। ভোরবেলা দুজনই উধাও। কুদ্দুস কাকার বাসরঘর আছে, কিন্তু সে রাতটা তাকে কাটাতে হয়েছিল হোটেলে—আবার সেখানেও ডবল ভাড়া, কারণ হোটেলওয়ালা জানত তিনি বিবাহিত, অথচ নববধূ সাথে নেই।
এই গল্পটা শুধু গল্প নয়।
উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য মানুষ জীবিকার টানে রাজধানী ঢাকায় আসেন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন, দিন গোনেন। সারা বছরের সেই অপেক্ষার সুতো একটাই লক্ষ্যে এসে মেলে—ঈদে একবার বাড়ি ফেরা, প্রিয়জনের মুখ দেখা, একটু নিশ্বাস নেওয়া। কিন্তু এই সামান্য চাওয়াটুকু পূরণ করতেই শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ।
রেলে আসনের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা শতগুণ বেশি, তাই স্বাভাবিক পথে টিকিট কেনা যেন সোনার হরিণ ধরার মতো। বাধ্য হয়ে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নেন—ট্রেনের ছাদে চড়েন, ইঞ্জিনের গায়ে ঝুলে থাকেন, এসি-নন এসি কামরায় গাদাগাদি করে ঢুকে পড়েন। তীব্র যানজট আর অসহ্য বাস ভাড়ার ভোগান্তি এড়িয়ে কেবল পরিবারের কাছে পৌঁছানোর এই ব্যাকুলতা প্রতি বছরই রেলস্টেশনকে রূপান্তরিত করে এক হৃদয়বিদারক রণক্ষেত্রে।
২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় সেই চিরচেনা দৃশ্যই আবার ফিরে এল। লক্ষ মানুষ হাতে টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন প্ল্যাটফর্মে, আর তাঁদের কেনা আসনে বসে রইল অন্য কেউ—জানালা আটকে, দরজা বন্ধ করে। টিকিটধারীরা নিজের সিট চোখে দেখলেন, কিন্তু ছুঁতে পারলেন না। ট্রেন ছেড়ে দিল, তারা রয়ে গেলেন পেছনে। তারপর বাসে ডবল ভাড়া দিয়ে ঘরে ফেরা।
প্রশ্ন হলো—এটা কি অনিচ্ছাকৃত ব্যর্থতা, নাকি সুচিন্তিত ব্যবস্থা?
স্টেশনে প্রবেশের আগেই টিকিট যাচাই হলে অনধিকার প্রবেশ ঠেকানো কঠিন ছিল না। কিন্তু সেটা হয়নি। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর টিটি এলেন, সাথে পুলিশ। বিনা টিকিটের যাত্রীদের কাছ থেকে জরিমানা বা নামমাত্র মূল্যে টাকা নেওয়া হলো—সেই টাকার হিসাব কোথায় গেল, কেউ জানে না। ২৪ তারিখ কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে দেখলাম, টিটিরা খুশিমনে সেই টাকার গোছা গুনছেন।
কুদ্দুস কাকার বাসরঘরে পুলিশ এসেছিল, কিন্তু অপরাধী ধরেনি—বরং বকশিশ নিয়ে চলে গিয়েছিল।
ইতিহাস যেন নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করে—কখনো গ্রামের বাসরঘরে, কখনো রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে।
এই মানুষগুলো কি এতটুকুও চাওয়ার অধিকার রাখেন না—নিরাপদে, সম্মানের সাথে বাড়ি ফেরার? সরকারের উচিত এই কষ্টের কথাটা বুকে ধারণ করা এবং ঈদযাত্রায় ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, টিকিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ যে জাতি তার শ্রমজীবী মানুষকে ঈদেও ঘরে ফিরতে দিতে পারে না সম্মানের সাথে, সে জাতির উৎসবের আলো আসলে কতটুকু উজ্জ্বল—সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
কেকে/এলএ