সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না : ট্রাম্প      নতুন নীতিমালায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম চালু      মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ      ঢাবিতে ভর্তি আবেদন ১১ নভেম্বর থেকে, পরীক্ষা শুরু ৫ ডিসেম্বর      সব বেসরকারি দাখিল-আলিম মাদ্রাসার অ্যাডহক কমিটি বাতিল      ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৭০ টাকা      ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু      
বিনোদন
‘হাওয়া’র পর সুমনের আরও পরিপক্ব ও অন্ধকার জগৎ ‘রইদ’
পায়েল বিশ্বাস
প্রকাশ: রোববার, ৩১ মে, ২০২৬, ৮:২১ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

মেজবাউর রহমান সুমনের বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘রইদ’ কোনো প্রথাগত বা সরলরৈখিক গল্পের নয়। যারা প্রেক্ষাগৃহে টানটান উত্তেজনা, মারপিট কিংবা চটকদার বিনোদন খুঁজতে যান, এই সিনেমা তাদের চরম হতাশ করবে। সিনেমাটি মূলত ‘সাধু’ নামের গরিব গ্রাম্য রাখাল ও তার নামহীন পাগলী বউয়ের রোজকার যাপিত জীবন ও নিঃসঙ্গতার গল্প। তবে এটি কেবলই এক গ্রামীণ দম্পতির গল্প নয়, বরং এর চেয়েও অনেক বেশি গভীর কিছু। পরিচালক এখানে কোনো নির্দিষ্ট বা কংক্রিট গল্প বলতে চাননি, বরং কিছু মেটাফোর বা সুতো ছড়িয়ে দিয়েছেন; যা দর্শকের অবচেতনের সাথে এক অন্তর্গত বোঝাপড়া তৈরি করে। 

এটি মূলত ‘স্টিম অফ কনশাসনেস’ ঘরানার সিনেমাটিক কবিতা, যা ক্রমাগত কাহিনীর যুক্তি ও ধারা মানার চাপ থেকে মুক্ত।


​পরিচালকের আগের সিনেমা ‘হাওয়া’র মতো এখানেও জাদুবাস্তবতার আবহ রয়েছে, তবে ‘রইদ’ যেন হাওয়ার থেকেও অনেক বেশি পরিপক্ব ও ডার্ক। পুরো সিনেমায় রয়েছে বাইবেলিক ও ইসলামিক মিথের সূক্ষ্ম ও প্রতীকী ব্যবহার। আদম-হাওয়ার গন্ধম ফল, নূহ নবীর নৌকা, মূসা নবীর অলৌকিক ব্যাঙ কিংবা মাদার মেরির অলৌকিক গর্ভধারণের মতো বিষয়গুলো স্ক্রিনে খুব সূক্ষ্ম মেটাফোর হিসেবে এসেছে, যা হলিউডের ‘মাদার’ সিনেমার থিম্যাটিক মিল মনে করিয়ে দেয়। ক্যামেরার কাজ ও চোখজুড়ানো ল্যান্ডস্কেপ শটগুলো ইরানি পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘টেস্ট অফ চেরি’র ফিলোসোফিকাল আবহকে মনে করালেও সুমন সেখানে শতভাগ দেশীয় মাটির ভাব ও লোকজ আচারের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। 

বাসুদেব বাউলের গান ও ছনের ঘরের নিখুঁত ডিটেইলিং সিনেমাটিকে ভিজ্যুয়াল ডায়েরির মতো অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।
এই চলচ্চিত্রের মূল শক্তি এর প্রধান দুই চরিত্রের অবিশ্বাস্য অভিনয়। বিশেষ করে নাজিফা তুষি নিজের গ্ল্যামারাস ইমেজ পুরোপুরি ভেঙে জট-পাকানো চুল, তেল চিটচিটে শরীর আর উদভ্রান্ত চোখের নিখুঁত গ্রাম্য পাগলীর চরিত্রে অবতীর্ণ হয়েছেন। নিজের চেনা রূপ ভেঙে পর্দায় এমন অবিশ্বাস্য রূপান্তর বাংলাদেশি সিনেমার ইতিহাসে সত্যি বিরল। অন্যদিকে ‘সাধু’ চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান বরাবরের মতোই মেথড অ্যাক্টিংয়ের চূড়ান্ত দেখিয়েছেন। তরল পদার্থের মতো তিনি এই গ্রামীণ চরিত্রে নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছেন, যার কারণে সিনেমা জুড়ে এই দুইটি চরিত্রের প্রতি দর্শকের এক ধরনের মায়া তৈরি হয়।

​এত চমৎকার নির্মাণ হওয়া সত্ত্বেও ‘রইদ’ কিছু জায়গায় খটকা তৈরি করে। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড বা লোকেশন সুনামগঞ্জের হাওড় অঞ্চল হলেও চরিত্রগুলোর মুখে শোনা গেছে খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা, যা বেশ দৃষ্টিকটু লেগেছে। এছাড়া সিনেমার প্রথমার্ধ যেভাবে আশা জাগায়, দ্বিতীয়ার্ধে এসে মেজবাউর রহমান সুমন রিপিটিটিভ দৃশ্য দিয়ে গল্পটা একই জায়গায় কিছুটা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ‘হাওয়া’র ক্লাইম্যাক্স যেমন সহজবোধ্য ছিল, ‘রইদ’ ঠিক এই জায়গাটায় মার খেয়েছে। এর সমাপ্তি কবিতার মতো ওপেন-এন্ডেড বা উন্মুক্ত হওয়ায় সাধারণ ম্যাস অডিয়েন্সের মাথার ওপর দিয়ে গেছে, যার কারণে সাধারণ দর্শকরা হলের ভেতরেই বিরক্তি প্রকাশ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আরেকটি বড় সমস্যা ছিল এর অতিরিক্ত ডার্ক টোন! এটি সিনেপ্লেক্সে সমস্যা নাই। বাট দেশের অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহের নিম্নমানের প্রজেক্টরের কারণে পর্দায় ম্যাড়মেড়ে ও বোরিং লাগার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পরিশেষে বলা যায়, ‘রইদ’ কোনো ব্যবসায়িক হিসেব-নিকেশের সিনেমা নয়, এটি আর্টহাউজ সমঝদার বা শিক্ষিত আরবান টার্গেট অডিয়েন্সের জন্য একটি বিশেষ ট্রিট। এই সিনেমা দেখে কেউ হাততালি দেবে না বা সিটি বাজাবে না, তবে সিনেমাটি হল থেকে বের হওয়ার পর শেষ হয় না, বরং দর্শকের মনের ভেতর আসল সিনেমাটা শুরু হয়। ম্যাস অডিয়েন্সের কাছে এটি হুদাই এক্সপেরিমেন্ট মনে হতে পারে, তবে সিনেমা সমঝদারদের মগজের ভেতর এটি দীর্ঘ সময় তোলপাড় তুলবে। বাংলাদেশি সিনেমার ‘নিউ ওয়েভ’ বা নতুন ধারার জন্য শিল্পের দায় থেকে এমন সাহসিকতাপূর্ণ সিনেমা আরও হওয়া উচিত।

রিভিউয়ার : লেখক, কবি, গবেষক, নৃত্যশিল্প, চট্টগ্রাম।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  হাওয়া   মেজবাউর রহমান সুমন   পরিপক্ব   অন্ধকার জগৎ   রইদ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close