মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
প্রবাসে রাজনৈতিক সংঘাতে ভাবমূর্তি সংকটে দেশ
হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৩:১৬ পিএম আপডেট: ০১.০৬.২০২৬ ৩:১৬ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের একটি পাবলিক পার্কে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অস্বস্তিকর বাস্তবতা। ভিডিওটি ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রতিবাদ সমাবেশ ও উত্তপ্ত অনলাইন বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে—দেশের রাজনৈতিক বিভাজন এখন আর শুধু বাংলাদেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের শহরগুলোতেও।

বহু বছর ধরেই যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা স্পেনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতপন্থি গোষ্ঠী বা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। জুলাই আন্দোলনের পর এনসিপির উত্থান সেই উত্তাপকে আরও বিস্তৃত করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা, কমিউনিটি সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কিংবা মিছিল-পাল্টা মিছিলকে কেন্দ্র করে এসব সংঘাত তৈরি হলেও বাইরের বিশ্বের কাছে এগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার প্রতিচ্ছবি হিসেবেই ধরা পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলো এখন ইউরোপের উগ্র ডানপন্থি রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হলো—বিদেশের মাটিতে নিজেদের রাজনৈতিক বিভাজনকে সংঘর্ষে রূপ দিয়ে আমরা কি শেষ পর্যন্ত পুরো বাংলাদেশি অভিবাসী সমাজকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি?

বিদেশে রাজনৈতিক সংঘাত কেন বিপজ্জনক সংকেত

লিসবনের ঘটনার পর পর্তুগালের উগ্র ডানপন্থি দল শেগার নেতা আন্দ্রে ভেনতুরা নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি শেয়ার করে মন্তব্য করেন, “তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক সহিংসতাও এখন আমদানি করা হয়েছে।” এই মন্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। কারণ স্থানীয় জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি বা অন্য কোনো দলের আদর্শিক বিভাজনের আলাদা গুরুত্ব নেই; তারা সবাইকে একই পরিচয়ে দেখে—বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে। ফলে কয়েকজনের রাজনৈতিক সহিংসতা পুরো কমিউনিটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এর আগেও পর্তুগালের মন্তিজো শহরে ‘দিস ইজ নট বাংলাদেশ (এটা বাংলাদেশ নয়)’ স্লোগানসংবলিত একটি রাজনৈতিক বিলবোর্ড নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। শেগা দল এই স্লোগান ব্যবহার করে মূলত অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকে উসকে দিতে চেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের, বিশেষত বাংলাদেশিদের, নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার কৌশল হিসেবেই এই প্রচারণা চালানো হচ্ছে। স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি একে বর্ণবাদী রাজনীতির উদাহরণ বলে আখ্যা দিলেও বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশিদের মধ্যে সংঘটিত সহিংস রাজনৈতিক আচরণই এমন প্রচারণাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

ইউরোপজুড়ে বর্তমানে অভিবাসন ইস্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানের কারণে বহু দেশে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক সংঘর্ষ সহজেই কট্টর ডানপন্থি দলগুলোর প্রচারণার উপাদান হয়ে উঠছে। তারা এসব ঘটনাকে ব্যবহার করে দাবি করতে পারে যে অভিবাসীরা শুধু শ্রমবাজারে নয়, নিজেদের দেশের রাজনৈতিক সহিংসতাও ইউরোপে নিয়ে আসছে। একটি ভাইরাল ভিডিও কখনো কখনো পুরো কমিউনিটির বিরুদ্ধে নেতিবাচক জনমত তৈরি করার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রবাসীদেরই দিতে হবে খেসারত

এ ধরনের ঘটনার সবচেয়ে বড় খেসারত দেন সাধারণ প্রবাসীরা, যাদের অধিকাংশের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। পর্তুগাল, ইতালি, ফ্রান্স বা স্পেনে থাকা হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেন কেবল বৈধভাবে বাঁচতে, পরিবার চালাতে এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সমাজে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকেই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়।

প্রথমত, বাসা ভাড়া পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়তে পারে। অনেক বাড়িওয়ালা বাংলাদেশিদের ‘সমস্যাপ্রবণ’ বা ‘রাজনৈতিকভাবে উত্তেজিত’ মনে করে এড়িয়ে যেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। তারা মনে করতে পারেন, বাংলাদেশি কর্মীরা ঝুঁকিপূর্ণ বা সংঘাতপ্রবণ। তৃতীয়ত, পুলিশের বাড়তি নজরদারি ও প্রশাসনিক কঠোরতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।

সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো অভিবাসন নীতিতে এর প্রভাব। পর্তুগালের মতো দেশে শ্রমভিত্তিক আবাসন বা নিয়মিতকরণের যেসব সুযোগ রয়েছে, সেগুলো আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। উগ্র ডানপন্থি দলগুলো তখন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নতুন ভিসা সীমিত করা, ডিপোর্টেশন বাড়ানো কিংবা অভিবাসন আইন আরও কঠোর করার জন্য। এর ফল ভোগ করেন সেই নিরীহ প্রবাসীরা, যারা বছরের পর বছর বৈধ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। কয়েকজন উগ্র কর্মীর কর্মকাণ্ডের দায় তখন পুরো কমিউনিটির কাঁধে এসে পড়ে।

এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়। বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি তরুণেরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে সংকটে পড়ে। তারা এমন একটি পরিচয়ের ভার বহন করতে বাধ্য হয়, যেটি রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটও তৈরি করতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এখন কোথায়

এই আত্মঘাতী সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এনসিপি কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—বিদেশের মাটিতে কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িতদের জন্য দলে কোনো জায়গা নেই। শুধু মৌখিক নিন্দা নয়, বাস্তব শাস্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে প্রবাসে রাজনৈতিক দলের ‘বিদেশ শাখা’ রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে ভাবা দরকার। বহু ক্ষেত্রে এসব শাখা স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে বিভক্ত করছে। প্রবাসীদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত স্থানীয় সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা—বিদেশের রাস্তায় দেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতাকে পুনরুৎপাদন করা নয়।

বাংলাদেশিরা আজ বিশ্বের বহু দেশে পরিশ্রম, ব্যবসা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সম্মান অর্জন করছেন। কিন্তু কয়েকজন উগ্র রাজনৈতিক কর্মীর আচরণ সেই অর্জনকে মুহূর্তেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। লিসবনের ঘটনা তাই কেবল একটি ভাইরাল ভিডিও নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক গুন্ডামি যে শেষ পর্যন্ত পুরো কমিউনিটিকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়, সেটি যত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব, ততই মঙ্গল। অন্যথায় ভবিষ্যতে বিশ্বের বহু দরজা হয়তো বাংলাদেশিদের জন্য আরও সংকুচিত হয়ে যাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, নোভা স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স, পর্তুগাল

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রবাস   রাজনৈতিক   সংঘাত   ভাবমূর্তি   সংকট   দেশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close