সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      
বিনোদন
প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকার ফুরোলেও মনের গহীনে রয়ে যায় ‘বনলতা সেন’
পায়েল বিশ্বাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
বনলতা সেন চলচ্চিত্রের পোস্টার

বনলতা সেন চলচ্চিত্রের পোস্টার

ঈদুল আজহার এই কোলাহলমুখর দিনগুলোতে রূপালি পর্দা যখন চেনা ফর্মুলার চড়া আলোয় উদ্ভাসিত, ঠিক তখনই প্রেক্ষাগৃহের নিভৃত অন্ধকারে এক নিঃশব্দ জাদুটোকা নিয়ে হাজির হলো ‘বনলতা সেন’। সরকারি অনুদানে নির্মিত মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের চিত্রনাট্য ও নির্দেশনায় এই চলচ্চিত্রটি কোনো রৈখিক গল্পের সস্তা বিনোদন নয়; এটি আসলে কবির সেই অমোঘ আত্মিক হাহাকার—‘দ্যা ফ্লেশ অফ পোয়েট্রি’-র এক সুরিয়ালিস্টিক বা পরাবাস্তব রূপায়ণ।

​নেট দুনিয়ার আলোচনা আর বিদগ্ধ দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায়, এই সিনেমা দর্শক সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। যারা প্রেক্ষাগৃহে কেবলই সস্তা বিনোদনের জোগান খোঁজেন, তারা হয়তো এর চলন ধরতে না পেরে মাঝপথেই খেই হারিয়েছেন। কিন্তু যারা শিল্পের শুদ্ধতম মায়ায় অবগাহন করতে ভালোবাসেন, তারা হল থেকে বেরিয়েছেন এক দীর্ঘস্থায়ী অলৌকিক ঘোর সঙ্গী করে।

​ইতিহাসের ধূসরতা ও কবির অন্তহীন পরিভ্রমণ
​‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে...’

​জীবনানন্দের এই কালজয়ী পঙ্ক্তিমালাকে সেলুলয়েডের ফিতায় বাঁধা এক অসম্ভব দুঃসাহসিক কাজ ছিল। পরিচালক সেই দুঃসাহস দেখিয়েছেন কোনো সরল ও চেনা আখ্যানের আশ্রয় না নিয়ে। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে যেন এক চিরন্তন একাকীত্বের কোলাহল।


​কবির চরিত্রে খায়রুল বাশার কেবল অভিনয় করেননি, তিনি তার শূন্য চাউনি, ধীরগতির অবয়ব আর বিষণ্ণতার মধ্য দিয়ে স্বয়ং জীবনানন্দ দাশের আত্মাকেই পর্দায় আবাহন করেছেন। আর যার নাম উচ্চারণমাত্রই বুকের ভেতর শতাব্দীর ক্লান্তি মুছে যায়, সেই ‘বনলতা সেন’ চরিত্রে মাসুমা রহমান নাবিলা যেন কোনো দূর অতীতের মায়াবী ক্যানভাস, শ্রাবস্তীর কারুকার্য থেকে হেঁটে এসেছেন বর্তমানের এই রুক্ষ্ বাস্তবতায়। সোহেল মণ্ডল, গাজী রাকায়েত ও নাজিবা বাশারের নিখুঁত পরিমিতিবোধ পুরো আবহটিকে আরও নিবিড় ও মনস্তাত্ত্বিক করে তুলেছে।

​পরাবাস্তবতার ক্যানভাস ও রূপকের বুনন

​এই সিনেমার কোনো সুনির্দিষ্ট বাঁধাধরা গল্প নেই, নেই কোনো চেনা খলনায়ক বা নায়কোচিত ক্লাইম্যাক্স। এখানে স্মৃতি, ইতিহাস আর কল্পনা এক অদ্ভুত মোহনায় এসে মিশেছে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ, লাবণ্য কিংবা মহিনের মতো চরিত্ররা একই সমান্তরালে উঁকি দিয়ে যায়, সেখানে তথাকথিত যৌক্তিক কাহিনি খুঁজতে যাওয়াটাই বৃথা। পরিচালক এখানে সময়ের ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। সিনেমাটোগ্রাফির প্রতিটি শট যেন একেকটি জলরঙের পেইন্টিং—যেখানে ট্রেনের জানালায় বয়ে যাওয়া বাংলার বিষণ্ণ প্রকৃতি, মাঝরাতের নিস্তব্ধতা আর কুয়াশার চাদর দর্শককে এক অপার্থিব জগতের যাত্রী করে তোলে।

বাপ্পা মজুমদারের সুরের গভীর দীর্ঘশ্বাস

​সিনেমাটি যদি চোখের জন্য এক পরম তৃপ্তি হয়, তবে কানের জন্য এক অলৌকিক আরোগ্য। মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের সুর ও বাপ্পা মজুমদারের সংগীত পরিচালনা এই সৃষ্টির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বাপ্পা মজুমদারের মায়াবী কণ্ঠে ‘এখানে কেউ নেই’ কিংবা মূল কবিতা অবলম্বনে তৈরি ‘দুজন’ গানটি যখন প্রেক্ষাগৃহের চারপাশের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন দর্শকের বুকের ভেতর এক চেনা হাহাকার মোচড় দিয়ে ওঠে। আবহসংগীত এখানে কোনো কৃত্রিম আবহ তৈরি করেনি, বরং চরিত্রের না-বলা কথা আর নীরবতাকে সুরের ডানায় ভর করে দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

শেষ কথা: এই মায়া কার জন্য?

​‘বনলতা সেন’ সবার জন্য নয়, আর সবার জন্য হওয়ার দায়ও এই চলচ্চিত্রের নেই। এটি সেই ক্লান্ত পরিব্রাজকদের জন্য, যারা জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দিন শেষে এমন এক আশ্রয়ের মুখোমুখি বসতে চায়, যা সমস্ত জাগতিক হিসাব-নিকাশ ভুলিয়ে দেয়।

​নিন্দুকেরা হয়তো এর মন্থর গতির সমালোচনা করবেন, কিন্তু জীবন কি সবসময় দ্রুত ছোটে? কিছু কিছু সৃষ্টিকে তো ডালপালা মেলার জন্য, হৃদয়ে আসন পাতার জন্য একটু সময় দিতে হয়। চটকদার হুজুগের এই যুগে ‘বনলতা সেন’ এক অনন্য রাজকীয় ব্যতিক্রম। বাংলা সিনেমা যে চেনা বৃত্তের বাইরে গিয়ে এমন আন্তর্জাতিক মানের নান্দনিক মেকিং ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা নিয়ে হাজির হতে পারে, এই চলচ্চিত্র তার এক অবিস্মরণীয় দলিল হয়ে থাকবে। প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকার ফুরিয়ে গেলেও নাটোরের সেই বনলতা সেন আমাদের মনের গহীনে রয়ে যাবেন এক চিরন্তন শান্তির প্রতীক হয়ে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকার   মনের গহীনে   বনলতা সেন   পায়েল বিশ্বাস  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close