চামড়া শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে মন ভারী হয়ে আসে। আমাদের দেশের উৎপাদিত চামড়ার ন্যায্য মূল্য আমরা পাই না। সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশি কোম্পানিগুলো চড়া মূল্যে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে। আমরাই আবার তাদের অন্যতম ক্রেতা। বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক এবং একই সঙ্গে আশঙ্কাজনক।
আমাদের দেশে পশুর চামড়া সংগ্রহের প্রধান উৎস বা মৌসুম হলো ঈদুল আজহার সময়। দেশব্যাপী ধর্মপ্রাণ মুসলমান সম্প্রদায় কুরবানি করে থাকে। ফলশ্রুতিতে বিপুল পরিমাণ কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে তৈরি হয় কোটি কোটি টাকার চামড়ার বাজার। একসময় বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত ছিল চামড়া শিল্প। এখন চামড়া নষ্ট হয়, দাম পড়ে যায়, মাদ্রাসা ও এতিমখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরকম বিপুল সম্ভাবনাময় শিল্প এখন গভীর সংকটের মুখোমুখি। প্রশ্ন জাগে, কেন এ সংকট?
বাংলাদেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত বলা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, এ খাত থেকে বছরে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসে। তথ্যটি খুবই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাতির নিচেই রয়েছে অন্ধকার। বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হারাচ্ছে।
ইপিবির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি আয় ছিল ১,২৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৩০.৮ টন স্বর্ণের মূল্যের সমান। অপরদিকে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয় ১,১৪৫.০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৭.৯ টন স্বর্ণের মূল্যের সমান। ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি প্রায় দেড় গুণের বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে আমাদের রপ্তানি আয় বিগত দশকে কমেছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, যা দিয়ে আরও একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল।
সংকটের বর্তমান চিত্রে আমরা দেখছি, চামড়ার দামে ব্যাপক ধস। যার কারণে চামড়া সংরক্ষণে পশু কুরবানিদাতাদের তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়, ময়লার ভাগাড়ে হাবুডুবু খায় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সম্পদ। মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর অন্যতম আয়ের খাত হলো কুরবানির পশুর চামড়া। চামড়া ব্যবস্থাপনার এ বেহাল দশার কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে বিপাকে। দাননির্ভর এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের একটি আয়ের খাত প্রায় হারাতে বসেছে। যে চামড়া একসময় এতিমখানার প্রধান আয়ের উৎস ছিল, এখন তা বিক্রি করে পরিবহন খরচ মেটানো সম্ভব হয় না।
অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়ে ফেলেছে। তারা এখন আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। ব্যাংকঋণের পরিমাণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক ট্যানারি বসে গেছে। অনেকগুলো ইতোমধ্যেই বন্ধ অথবা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সরকারের নীতিগত দুর্বলতাগুলো খাতটিকে পিছিয়ে রেখেছে। নব্বইয়ের দশক থেকেই হাজারীবাগের ভয়াবহ দূষণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। ট্যানারিগুলো সরানোর জন্য আদালত, পরিবেশবাদী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ছিল অনেক চাপ। অবশেষে, ২০০৩ সালে তৎকালীন সরকার চামড়া শিল্পনগরী ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৭ সালের মধ্যে এ প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়।
এ স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ দূষণ কমানো ও আধুনিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ট্যানারি স্থানান্তরের পাশাপাশি দূষণটাও স্থানান্তরিত হয়েছে সাভারে। শুধু পার্থক্য এটুকুই যে, আগে চামড়া শিল্পের বর্জ্যে দূষিত হতো বুড়িগঙ্গা, আর এখন দূষিত হয় ধলেশ্বরী নদী।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে বিপুল বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে সলিড ওয়েস্ট, ইটিপি স্লাজ ও ক্রোমিয়াম স্লাজ অন্যতম। এগুলোর নিরাপদ অপসারণের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। ফলে মাটি ও পানি দূষণের ঝুঁকি বেড়েছে। পরিবেশগত অবস্থাও আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারেনি। যার কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি এখনো আন্তর্জাতিক ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি)’-এর সনদ পায়নি। ফলে বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি অর্ডার দিচ্ছে না। এতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে রপ্তানি আয়।
২০০৫ সালে নাইকি, অ্যাডিডাস ও টিম্বারল্যান্ডের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘এলডব্লিউজি’ প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে এ সংস্থার অধীনে বিশ্বের নামিদামি প্রায় ১ হাজার ব্র্যান্ড ও সরবরাহ খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সুতরাং এ সনদ ব্যতীত বিশ্ববাজারে রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রায় অসম্ভব।
সনদবিহীন ট্যানারিগুলো প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া বিক্রি করে ৪৫ সেন্ট থেকে ১.৬ ডলারে। অপরদিকে, সনদধারী ট্যানারিগুলো একই চামড়া বিক্রি করে দ্বিগুণেরও বেশি দামে। বাংলাদেশে শুধু ৮টি ট্যানারির এলডব্লিউজি সনদ রয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই ট্যানারিগুলোর সবগুলোই বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী, সাভার এলাকার বাইরে অবস্থিত। কোম্পানিগুলো নিজ উদ্যোগে ইটিপি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। তাহলে সমস্যা শুধু শিল্পনগরী এলাকার ট্যানারিগুলোতে।
এখানে একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (সিইটিপি) করা হয়েছে। বাংলাদেশি ও চীনা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে এটি বাস্তবায়িত হলেও এর কার্যকারিতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ডিজাইন ত্রুটিপূর্ণ, নিম্নমানের ঢালাইসহ নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়। সিইটিপির ধারণক্ষমতা ১৪ হাজার ঘনমিটার, যেখানে আমাদের প্রয়োজন ২৫ হাজার ঘনমিটার। কুরবানির সময় এ চাহিদা বেড়ে হয় প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার।
আমাদের ১২ থেকে ১৫টি ট্যানারি সনদ পাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আটকে আছে। সনদপ্রাপ্তির জন্য মোট নম্বর ১,৭১০ ধরা হয়। এর মধ্যে কারখানাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ১,৪০০ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৩০০ নম্বর। কারখানার বিষয়গুলোতে তারা ভালো করেছে। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির জন্য খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের। এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
এই দুর্বলতার সুযোগ পুরোদমে কাজে লাগিয়েছে চীন। আমাদের এখন আধা-প্রক্রিয়াজাত ‘ক্রাস্ট লেদার’ চীনের কাছে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। যে চামড়া আগে প্রতি বর্গফুট ১.৫ ডলারে বিক্রি হয়েছে, একই চামড়া এখন চীনের কাছে ৬০-৬৫ সেন্টে বিক্রি হচ্ছে। আবার বাংলাদেশের যেসব কোম্পানির সনদ রয়েছে, তারা ফিনিশড লেদার নিয়ে কাজ করতে পারে। কোম্পানিগুলো বছরে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের ফিনিশড লেদার আমদানি করে থাকে।
আমাদের চামড়া আমরা কম দামে রপ্তানি করছি, আবার সেই চামড়া বিদেশে প্রক্রিয়াজাত হয়ে আমাদের কাছেই বেশি দামে আমদানি হচ্ছে। একদিকে যেমন আমাদের রপ্তানি আয় কমছে, অন্যদিকে ক্রমাগত বাড়ছে আমদানি ব্যয়। পণ্য আমাদের, কিন্তু মুনাফা লুটছে বিদেশি বেনিয়ারা।
চীন ধীরে ধীরে বাজার, মূল্যনির্ধারণ, কাঁচামাল ক্রয় এবং রপ্তানিনির্ভরতার মাধ্যমে শক্তিশালী প্রভাব বা আধিপত্য তৈরি করেছে। বিশেষ করে সাভার ট্যানারি শিল্প ও কাঁচা চামড়ার বাজার এখন অনেকাংশেই চীনা ক্রেতানির্ভর। ঈদুল আজহার সময় চীনা ক্রেতারা কম দামে ‘বাল্ক অর্ডার’ দেয়। আমাদের দেশীয় ট্যানারিগুলো এই অফার লুফে নেয়। আর এতে করে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ চীনের জন্য সহজ হয়।
এ শিল্পের আরেকটি বড় সংকট হলো চামড়া সংগ্রহে সমন্বয়হীনতা। ২০২৫ সালে সিপিডির একটি জরিপে বলা হয়েছে, সে বছর পশু কুরবানি হয়েছে ৯১ লাখের বেশি। কিন্তু মোট চামড়া সংগ্রহের সংখ্যা ছিল ৫৭ লাখের কাছাকাছি। একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চামড়ার কোনো হদিস মেলে না। এই চামড়া অন্য কোনো দেশে পাচার হয় কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। উপরন্তু, অদক্ষ হাতে চামড়া ছাড়ানো এবং লবণ ছাড়া খোলা জায়গায় সংরক্ষণের কারণে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়।
সরকার ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’, ২০ কোটি টাকার লবণ এবং বিভিন্ন মনিটরিং সেল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১,২৫০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এগুলো আপাতদৃষ্টিতে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সঠিকভাবে তদারকি করতে না পারলে সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
আমার মনে হয়, চামড়া শিল্পের উন্নয়নের জন্য এখন সবার আগে সিইটিপির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শুধু এ কারণেই পুরো ইউরোপীয় বাজার আমরা ধরতে পারছি না।
লেখক : শিক্ষক