আসন্ন বর্ষা মৌসুম ঘিরে দেশজুড়ে ডেঙ্গুর বিস্তারের শঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাও বলছে, ঢাকাসহ চার জেলা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছর ভয়াবহ হতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সে জন্য এখন থেকেই সরকার, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলছেন তারা।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, ঝুঁকি মোকাবিলায় ডিএসসিসি ৭ জুন থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি ওয়ার্ডে পাঁচ দিনব্যাপী বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করবে। এরপর পরবর্তী ধাপে মাঝারি ঝুঁকির ৩৬টি ওয়ার্ডে একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণের ৬৩ ওয়ার্ড ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে, বেশি শঙ্কা ২৭টিতে : ডিএসসিসি প্রশাসক
এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমের আগে এডিস মশার লার্ভা জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৬৩টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। মশার ঘনত্বের ভিত্তিতে এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বর্ষাপূর্ব এডিস মশার লার্ভা জরিপ-২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ ও কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কিত এক অবহিতকরণ সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জরিপের বিস্তারিত ফলাফল ও আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
আবদুস সালাম বলেন, গেল ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী পরিচালিত মশক জরিপে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়িকে নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। সম্পূর্ণ দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত এ জরিপে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন। তথ্য সংগ্রহে নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে আধুনিক কোবো টুলবক্স ব্যবহার করা হয়।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ডিএসসিসির ৬৩টি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে ২৭টি ওয়ার্ডকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রশাসক আরও জানান, পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৩৮টি বাড়ির মধ্যে ২৮১টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা (লার্ভার পরের স্তর) পাওয়া গেছে। আক্রান্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে বহুতল ভবনে ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, জরিপে মশার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পানি ধারণকারী পাত্র চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের ড্রাম, মেঝেতে জমে থাকা পানি এবং বালতিতে জমে থাকা পানিতে উল্লেখযোগ্য হারে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রয়োজন। বাসাবাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।
তার কথায়, “অনেকে বাথরুম বা অন্যান্য স্থানে বালতিতে কয়েক দিন পানি জমিয়ে রাখেন। দুই-তিন দিনের মধ্যেই সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।”
আবদুস সালাম বলেন, সাধারণ ধারণার বিপরীতে এডিস মশা নোংরা বা পচা পানিতে নয়, বরং পরিষ্কার ও স্থির পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে আগামী ৬ জুন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে একটি সচেতনতামূলক র্যালির আয়োজন করা হবে। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকাতেও পরিচালিত হবে।
এ ছাড়া ৭ জুন থেকে ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকা ২৭টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য বিভাগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে পাঁচ দিনব্যাপী বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিশাত পারভীন।
ঝুঁকিতে ঢাকাসহ ৪ জেলা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকাসহ চারটি জেলায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকাসহ ঢাকা, বরিশাল, নরসিংদী ও কক্সবাজার জেলায় ব্রুটো ইনডেক্সে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ৭৬ থেকে ৯৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি হলেই সেটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষক দল গত এক মাস ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এডিস মশার নমুনা সংগ্রহ করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪৮ শতাংশ এডিস লার্ভা পাওয়া গেছে ভবনের পার্কিং এলাকা এবং বেজমেন্টে। এ ছাড়া ১৬ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে নির্মাণাধীন ভবনে। এসব জায়গা মশার প্রজননের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কিছু জায়গায় ব্রুটো ইনডেক্স ৯৩ পর্যন্ত উঠেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একইভাবে কক্সবাজার, বরিশাল ও নরসিংদীতেও লার্ভার ঘনত্ব ৭৬ থেকে ৯৩-এর মধ্যে রয়েছে, যা ডেঙ্গু বিস্তারের বড় কারণ হতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ভবনের পার্কিং, বেজমেন্ট এবং জমে থাকা পানির ড্রাম বা বালতির দিকে নজর দিলে প্রায় ৭০ শতাংশ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অর্থাৎ নগরবাসীর সচেতনতা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে।
কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, ঈদের আগের তুলনায় ঈদের পর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বৃদ্ধি ঠেকাতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
ডেঙ্গুর বিভিন্ন পরীক্ষার খরচে ৮০ শতাংশ ছাড়ের আহ্বান
বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার খরচ কমাতে বিভিন্ন পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
গত মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও গাইডলাইনবিষয়ক এক সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাব্যয় কমানোর বিষয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষার খরচে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হবে। কোনো রোগীর পরীক্ষার খরচ ১০ হাজার টাকা হলে এর মধ্যে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
কেকে/এলএ