অর্থনীতির চেনা সমীকরণ বলছে—বাজারে ক্রেতা কম থাকলে কিংবা চাহিদা কমলে পণ্যের দাম কমতির দিকে থাকে। কিন্তু দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে এখন চলছে সম্পূর্ণ উল্টো পুরাণ। বাজারে ক্রেতা নেই, বেচাকেনায় চরম মন্দা; অথচ প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই আকাশচুম্বী। বাজারের এই অদ্ভুত আচরণে একদিকে যেমন ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ ক্রেতারা, অন্যদিকে বিক্রি কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিন রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য দিনের তুলনায় বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি বেশ কম। বিক্রেতারা পণ্য সাজিয়ে বসে থাকলেও ক্রেতার দেখা মিলছে না। কিন্তু এই মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের সবজি ও ব্রয়লার মুরগির দাম চড়া। সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো পণ্যের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজারে আসা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের ক্রেতারা বলছেন, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারে এসে কাটছাঁট করেও প্রয়োজনীয় সওদা করা যাচ্ছে না। এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাজারে মানুষ কম, বিক্রি কম, তাহলে দাম কমছে না কেন? সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই আজব নিয়ম দুনিয়ার কোথাও নেই।”
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, দাম বাড়ানোর পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। পাইকারি বাজার থেকেই তাদের চড়া দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। উপরন্তু, বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে দ্বিগুণ লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
নিত্যপণ্যের বাজারের ঊর্ধ্বগতির পর এবার সাধারণ মানুষের পুষ্টির প্রধান উৎস মাছের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাজারে গিয়ে পছন্দের মাছ কিনতে না পেরে খালি হাতে কিংবা কাটছাঁট করে সামান্য পরিমাণ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন মধ্য ও নিম্নবিত্তরা। বাজারের এই ‘আগুনে দামে’ ভোক্তাদের পাতে এখন আমিষের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এখন সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে ঢেঁড়শ, যা কেজিপ্রতি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০ টাকায়। এছাড়া পেঁপে, সাদা বেগুন, চিচিঙ্গা, পটল, ঝিঙে, ধুন্দল ও উস্তা কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা দরে।
সাধারণত ঈদের তিন-চার দিন কাঁচা মরিচ, লেবু, শসা, গাজর ও টমেটোর চাহিদা বেশি থাকে। ফলে এসব পণ্যের দাম এ সময়ে বেশি থাকে। বাজারে প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে। শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং গাজর ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে।
এছাড়া বাজারে করলা কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। কাঁকরোল, কালো গোল বেগুন ও বরবটিও ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস লাউ পাওয়া যাচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। আর কাঁচা আম পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ টাকা কেজি দরে।
বাজারে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সবজির বাজার তো আগেই শেষ, ভেবেছিলাম একটু মাছ বা মাংস নেব। কিন্তু বাজারে এসে দেখি হাত দেওয়ার উপায় নেই। বাচ্চার মুখে একটু প্রোটিন তুলে দেব, সেই উপায়ও আর রাখেনি বাজার সিন্ডিকেট। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো মিল নেই।”
দাম কমেছে মুরগির, বেড়েছে ডিমের
সপ্তাহের ব্যবধানে কমেছে পোলট্রি মুরগির দাম। তবে বেড়েছে ডিমের দাম। ব্রয়লার মুরগির প্রতি কেজি কিছুটা কমে ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাকিস্তানি সোনালি মুরগি ৩২০-৩৩০ টাকা থেকে কমে ৩০০-৩১০ টাকা, পাকিস্তানি হাইব্রিড জাতের মুরগি ২৯০-৩০০ টাকা থেকে কমে ২৭০-২৮০ টাকা, পাকিস্তানি লেয়ার গত সপ্তাহের মতোই ৩৩০-৩৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০-৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
শান্তিনগর ফুটপাতের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে করলা, কাঁচামরিচ, আলু ও পেঁয়াজ বিক্রি করেন আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, “প্রতিদিন ভোরে নরসিংদী থেকে কলা নিয়ে আসি। স্বাভাবিক দিনে ভালো বিক্রি হয়, কিন্তু ঈদের ছুটিতে মানুষ নেই বললেই চলে। আজও (গতকাল) খুব কম বিক্রি হয়েছে।”
মালিবাগের বাসিন্দা রাজন মিয়া বলেন, “ঢাকায় মানুষ কিছুটা কম থাকায় এর প্রভাব বাজারেও দেখা যাচ্ছে। সাধারণ দিনের তুলনায় আজ অনেক ফাঁকা। দ্রুত বাজার করে চলে যেতে পারছি।”
এদিকে মিরপুরের বিভিন্ন সড়কের পাশে থাকা অস্থায়ী কাঁচাবাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। সবজি, মাছ ও ফলের দোকানগুলোতে বিক্রেতারা অপেক্ষা করলেও ক্রেতা ছিল হাতে গোনা। অনেক দোকান পুরোপুরি বন্ধও দেখা গেছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিই নয়, বরং সরবরাহ চেইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং নিয়মিত বাজার তদারকির অভাবেই দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পুষ্টির সুরক্ষায় মাছ ও মাংসের বাজারে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে সরবরাহ বা চাহিদার কোনো ঘাটতি নেই। মূলত অসাধু সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং তদারকি সংস্থার দুর্বল নজরদারির কারণেই বাজারের এই ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি। বাজার নিয়ন্ত্রণে শুধু খুচরা পর্যায়ে নয়, বরং পাইকারি আড়ত ও করপোরেট সরবরাহকারীদের ওপরও কঠোর নজরদারি চালানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেকে/এলএ