শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম: নীরবে বাড়ছে এইডসের প্রকোপ      ঝুলে আছে ক্রসফায়ারে হত্যার বিচার      বিচারের নামে বর্বরতা      ভূমি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চাইল মন্ত্রণালয়      অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ভারত : রণধীর জয়সওয়াল      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      গোপালপুরে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হামলা-ভাঙচুর, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
গ্রাম্য সালিশ
বিচারের নামে বর্বরতা
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ৯:২৮ এএম আপডেট: ০৬.০৬.২০২৬ ১০:৫৮ এএম

গ্রাম্য সালিশে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও মব তৈরি করে সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনকে অবজ্ঞা করে অপরাধের শাস্তি কার্যকর করছে স্থানীয় জনতা। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনা আইনের শাসনের জন্য হুমকি। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতারও বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, এমন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সমাজে সহিংসতা ও নৈরাজ্য আরও বৃদ্ধি পাবে।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই স্থানীয়ভাবে শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রকাশ্যে এক ব্যক্তিকে বেঁধে পেটানো, ফরিদপুরে কথিত মাদক ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ এবং হবিগঞ্জে ডাকাতির অভিযোগে এক ব্যক্তির বসতঘরে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের কাইতলা (দ.) ইউনিয়নের নারুই বাজারে গ্রাম্য সালিশে মাদক বিক্রির অভিযোগে অভি মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, নির্যাতনের সময় ওই ব্যক্তি চিৎকার করে কাঁদছেন, আর আশপাশে থাকা অনেকে পুরো ঘটনা দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছেন।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একপক্ষ বলছে, এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের কারণে মানুষ ক্ষোভ থেকে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। অপর পক্ষ বলছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলেও আইন অনুযায়ী বিচার করার দায়িত্ব আদালতের, সাধারণ মানুষের নয়।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশিষ্ট লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালাম। গতকাল ভাইরাল হওয়া এ ভিডিওটি শেয়ার করে তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘প্রিয় বিএনপি! আমার মনে হয় আপনারা বুঝতে পারছেন না যে, কোন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আপনারা পড়েছেন। রাষ্ট্রের দুইটা ফাংশন আছে, যেটা কখনোই প্রাইভেটাইজ করা যায় না, শুধু সরকারই করতে পারে। বিচার ও ভায়োলেন্স। এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে, দুটো কাজই প্রাইভেট সিটিজেনরা স্বউদ্যোগে করা শুরু করেছে। সেদিন দেখলাম, তৌহিদী জনতা মাশাআল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা বন্ধ করে দিয়েছে। এই যদি হয় আপনাদের লারেলাপ্পা অবস্থা—গুডলাক! আপনারা দুই বছর দূরে আছেন যে, এইসব ওয়েল-মিনিং ফ্যানাটিকরা সিনেমা হলের ভেতরে বোমা মারবে। মার্ক মাই ওয়ার্ডস।’

বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, ‘আপনারা গভর্ন্যান্সের সর্বোচ্চ অপরাধ করতেছেন। You are appearing bloody weak and you will have to pay for it dearly. আপনারা মনে করছেন যে, ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রাগ করে, এমন কিছুই আমরা করব না। ভালোবাসা দিয়ে সারিয়ে তুলব। ছাত্রলীগকে যেমন সারিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন জাফর ইকবাল সাহেব। এগেইন—গুড লাক!’

অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম লিখেন, ‘ডানে এবং বামে উভয় দিক থেকে আপনারা জনপ্রিয়তা হারাবেন অবিশ্বাস্য গতিতে। যদি জনগণই বিচার করে ও শাস্তি দিতে পারে, তাহলে আপনাদের কী দরকার? সিরিয়াসলি! অচিরেই দেখবেন যে, জনগণ আপনাদের ট্যাক্সও না দেওয়া শুরু করবে এবং আপনারা ইউনূস সরকারের মতো মামু সরকার হয়ে যাবেন। কোনো গ্রাম যদি বিচার করে ও বিচার ডিসপেন্স করে—যদি ৫০০ জন সেখানে উপস্থিত থাকে, সেই ৫০০ জনেরই বিচার করেন। যেই দেশে সাধারণ জনগণ মিলেমিশে প্রকাশ্যে বিচার ডিসপেন্স করা শুরু করে, সেই দেশে সরকারকে জনগণ সমীহ করে না।’

ফেসবুকে দেওয়া এ পোস্টে তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে সিরিয়াস হন। আমার মনে হয় আপনারা বুঝতে পারছেন না যে, কোন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আপনারা পড়েছেন।’

এ বিষয়ে নবীনগর থানার ওসি মোর্শেদ আলম চৌধুরী বলেন, ‘ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনাটি জানার পরপরই সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ নির্দয়ভাবে মাদক বিক্রেতাসহ কোনো ব্যক্তিকেই প্রকাশ্যে এভাবে হাত-পা বেঁধে পেটানোর মতো জঘন্য কাজ করতে পারে না।’

এ ছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবীনগর সার্কেল) পিয়াস বসাক বলেন, পুলিশকে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার পৌরসদরের চণ্ডীদাসদী গ্রামে কথিত মাদক ব্যবসায়ী ময়না বেগম ও তার সহযোগী আইয়ুব আলীর নির্মাণাধীন ভবন ও বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে এলাকাবাসী। এতে তাদের ঘরের মালামাল ও স্থাপনা পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তারা বিপুল অর্থসম্পদ অর্জন করে বহুতল ভবন নির্মাণসহ উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের কার্যকলাপের কারণে এলাকার বহু কিশোর ও যুবক মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তবে এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পুরানগাঁও গ্রামে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তির বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। গত রোববার মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়াহিদ মিয়া নামের ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে পুরানগাঁও গ্রামে বসবাস করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ডাকাত দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতি মামলা আছে। বিভিন্ন সময় চুরি ও ডাকাতির মাধ্যমে লুট হওয়া অটোরিকশা, গাড়িসহ নানা মালামাল তার বাড়িতে এনে রাখা হতো।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এদিন রাতে পুরানগাঁও গ্রামের পঞ্চায়েত কমিটির একটি সভা হয়। সভায় ওয়াহিদ মিয়ার কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। গ্রামবাসীরা বলেন, তার কারণে গ্রামের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকে অভিযোগ করেন, একাধিকবার বিষয়টি নবীগঞ্জ থানাকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সভা শেষ হওয়ার পর রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ একদল লোক ওয়াহিদ মিয়ার বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘরটি জ্বলতে থাকে। খবর পেয়ে নবীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও নবীগঞ্জ থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর মধ্যেই বসতঘরটির ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়।

এ বিষয়ে নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোনায়েম মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ওয়াহিদ মিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতির মামলা আছে। তবে পুলিশ তাকে সহযোগিতা করেছে, এ অভিযোগ সঠিক নয়। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  গ্রাম্য   সালিশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close