শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম: নীরবে বাড়ছে এইডসের প্রকোপ      ঝুলে আছে ক্রসফায়ারে হত্যার বিচার      বিচারের নামে বর্বরতা      ভূমি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চাইল মন্ত্রণালয়      অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ভারত : রণধীর জয়সওয়াল      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      গোপালপুরে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হামলা-ভাঙচুর, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সাজানো ঘটনার শিকার দুই ভাই
ঝুলে আছে ক্রসফায়ারে হত্যার বিচার
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ৯:৩৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

চট্টগ্রামের দুই সহোদর মো. আজাদুল ইসলাম আজাদ ও মো. মোহাম্মদ ফারুক। একজন প্রবাসী, আরেকজন পেয়ারা চাষি। ২০২০ সালের জুলাই মাসে ক্রসফায়ারে এই দুইজনের প্রাণ কেড়ে নেয় পুলিশ। এক রাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে পুলিশ। তবে দাবিকৃত চাঁদার টাকা না পেয়ে পরিকল্পিতভাবে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। সে সময় এ ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম দীর্ঘ ছয় বছরেও শুরু হয়নি। মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি, মেজর সিনহা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রদীপ কুমার দাশসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বারবার স্থগিত থাকায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।

নিহতদের পিতা সত্তরোর্ধ্ব আমিনুল হক বলেন, ‘আমার ছেলেরা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। টাকার জন্য পুলিশ তাদের মিথ্যা মাদক মামলায় জড়িয়ে হত্যা করেছে। ছয় বছর ধরে আদালতে ঘুরছি, কিন্তু বিচার পাচ্ছি না।’

মামলার বাদী নিহতদের বোন রিনাত সুলতানা শাহীন জানান, ২০২০ সালের ১৩ জুলাই রাতে চন্দনাইশ এলাকা থেকে তার ছোট ভাই মো. আজাদুল ইসলাম আজাদকে আটক করে টেকনাফ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ১৫ জুলাই বড় ভাই মো. ফারুককেও আটক করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, আজাদের মুক্তির জন্য ৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বড় ভাই ফারুককেও আটক করে টেকনাফে নেওয়া হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, চন্দনাইশ থানার তৎকালীন ওসি কেশব চক্রবর্তী চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে তাদের আটক করেন এবং পরে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশের মাধ্যমে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে দুই ভাইকে হত্যা করা হয়। বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, টেকনাফ থানা থেকে পাঠানো ওয়ারেন্ট স্লিপে দুই ভাইয়ের কারও নাম ছিল না। চন্দনাইশ থানায়ও তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি ছিল না। এরপরও তাদের আটক করে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, ৮ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ২০২০ সালের ১৬ জুলাই সকালে ওসি প্রদীপ নিজেই ফোন করে লাশ নিয়ে যেতে বলেন। পরে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে দুই ভাই নিহত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। পরদিন মাদক উদ্ধারের একটি মামলায় অভিযানে নিহত হিসেবে তাদের দেখানো হয়।

নিহত ফারুক পেশায় পেয়ারা চাষি ও মোবাইল ফোন মেরামতকারী ছিলেন। তার ছোট ভাই আজাদ ছিলেন বাহরাইনপ্রবাসী। করোনাকালে দেশে ফিরে এ ঘটনার শিকার হন তিনি। দুই ভাই চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগরের ফকিরপাড়ার আমিনুল হকের ছেলে।

একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় পিতা আমিনুল হক বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে প্রবাসে থাকত। করোনার সময় বাহরাইন থেকে দেশে এসেছিল। ওই চক্রটি ধারণা করেছিল, আমার ছেলেদের ধরলে বিপুল অর্থ পাওয়া যাবে। এজন্য নিজবাড়ি থেকে আটক করে টেকনাফে নিয়ে গিয়ে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দেয়নি বলে পুলিশ আমার ছেলেদের ক্রসফায়ার দেয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার সাজানো-গোছানো সংসার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমার নিরপরাধ দুই ছেলেকে মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার ছেলেদের ফেরত পাব না, জানি। তবু শুধু বিচারটা চাই, যাতে অন্য কোনো পিতা আমার মতো সন্তানহারা না হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে আজাদ অবিবাহিত ছিল। তবে বড় ছেলে ফারুকের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। সে বাবাকে ছাড়া বড় হচ্ছে। আমার নাতনির চেহারা দেখলে কষ্টে বুক ভেঙে যায়।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিহতদের বোন রিনাত সুলতানা শাহীন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ পাঁচজন পুলিশ সদস্য এবং চন্দনাইশ থানার আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে পরিকল্পিতভাবে দুই ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন তলব করেন। পরে কক্সবাজার পুলিশের প্রতিবেদনে টেকনাফ থানার মাদক উদ্ধার মামলায় নিহত দুইজনের তথ্য উল্লেখ থাকায় চট্টগ্রামে দায়ের করা হত্যা মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখেন আদালত। একই সঙ্গে টেকনাফ থানার ওই মাদক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর টেকনাফ থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ সোহেল আহমদ খান আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও কক্সবাজার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্বাহী তদন্ত প্রতিবেদন এখনো না পাওয়ায় মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে মামলার বিচার কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে।

এদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ও আইনজীবীর অভিযোগ, সাবেক ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীদের রক্ষায় একটি প্রভাবশালী মহল ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে।

মামলার আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠক অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার অজুহাতে মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। নির্বাহী তদন্তের অজুহাতে বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত করা আইনের অপব্যবহার।’

তিনি আরও বলেন, ‘আদালতে পূর্বে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডির তথ্য পাওয়া যায়নি। তারপরও তাদের চন্দনাইশ থেকে তুলে নিয়ে টেকনাফে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

এদিকে নিহতদের বোন সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নির্বাহী তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে আবেদন করেছেন। পরিবারের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হোক।

জানা যায়, টেকনাফ থানার ওসি থাকাকালে প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের মামলায় আদালত প্রদীপ ও লিয়াকতকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। অথচ এর পনেরো দিন আগে টেকনাফে ধরে নিয়ে গিয়ে ফারুক ও আজাদকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করে এই ওসি প্রদীপ ও কেশবরা। কিন্তু ছয় বছরেও বিচার শুরু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করছে ভুক্তভোগী পরিবার।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:   ক্রসফায়ার   হত্যা   বিচার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close