রাজধানীতে গণপরিবহনের অন্যতম প্রধান বাহন বাস। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাতে বাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে নগরীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী অনেক বাসের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও জরাজীর্ণ। কোথাও জানালার কাচ ভাঙা, কোথাও ফেটে গেছে সামনের উইন্ডশিল্ড। আবার অনেক বাসে নেই কার্যকর ব্রেকলাইট বা নির্দেশক বাতি। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কিছু বাস থেকে নির্গত হচ্ছে ঘন কালো ধোঁয়া, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্মগেট, মহাখালী ও উত্তরার আবদুল্লাহপুর এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অনেক বাসের বডি মরিচাধরা, দরজা ঠিকমতো বন্ধ হয় না, সিট ছেঁড়া এবং ভেতরের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর।
ফার্মগেট থেকে উত্তরাগামী একটি বাসের যাত্রী মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। বাসের জানালার কাচ ভাঙা, সিট নড়বড়ে। ভাড়া ঠিকই বাড়ানো হয়, কিন্তু সেবার কোনো উন্নতি দেখি না।’
এ সময় ফার্মগেটে অপেক্ষমাণ বেসরকারি চাকরিজীবী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘অনেক বাসে ওঠার পর মনে হয় এটি চলার উপযোগী নয়। হঠাৎ ব্রেক করলে দরজা খুলে যায়, আবার অনেক বাস থেকে এত ধোঁয়া বের হয় যে পাশে দাঁড়ানোই কষ্টকর।’
উত্তরায় কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাকিব হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাসের ভেতরের অবস্থা যেমন খারাপ, তেমনি বাইরেও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। অনেক বাসের পেছনের লাইট নষ্ট থাকায় রাতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।’ তার মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
একটি বেসরকারি পরিবহন কোম্পানির একজন চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অনেক মালিক খরচ বাঁচাতে সময়মতো বাস মেরামত করেন না। ফলে ত্রুটি নিয়ে মাসের পর মাস বাস চালানো হয়। এতে চালক ও যাত্রী উভয়ই ঝুঁকিতে থাকে।’
বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী, ৩৯ হাজার ১৬৯টি বাস ও মিনিবাস এবং ৪১ হাজার ১৪০টি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ট্যাংকারের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের চাপে সড়ক এখনো পুরোনো যানবাহনের দখলেই রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারের নানা উদ্যোগেও সড়কে কমানো যাচ্ছে না ২০ বছরের বেশি পুরোনো এবং ত্রুটিপূর্ণ বা ফিটনেসবিহীন বাস। আইন অনুযায়ী, বাস-মিনিবাসের ২০ বছর এবং ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) ধরা হয়। কিন্তু ওই সময়ের পরও দেশের সড়ক দাবিয়ে বেড়াচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ এসব বাহন।
এরই মধ্যে রাজধানীতে একটি যাত্রীবাহী জরাজীর্ণ মিনিবাসের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বাসটির নিবন্ধন ও রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পর সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সম্প্রতি এক মোটো ব্লগার রাজধানীর একটি সড়কে চলাচলরত বাসটির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ভিডিওতে বাসটির পেছনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়, যা নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
পরবর্তীতে মন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বাসটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। নিবন্ধন ও রুট পারমিট বাতিলের পাশাপাশি মালিকপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশের কোনো সড়কেই ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, সড়ক-মহাসড়কে মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় মোটরযান অবাধে চলাচল করায় যাত্রী ও পথচারীরা নানাবিধ ঝুঁকিতে পড়ছেন। যখন-তখন স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার কারণে হতাহতের ঘটনা বাড়ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে কিছু বাস এতটাই আনফিট যে, যাত্রী বহনের জন্য একেবারেই অনুপযোগী। কিন্তু গণপরিবহনের স্বল্পতার কারণে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে ওসব বাসে ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করছে। এসব বাসের অধিকাংশই রংচটা, জানালার কাচ ভাঙা, সিট ভাঙাচোরা এবং নোংরা। এমন অবস্থায় দ্রুত অভিযানের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনকে জরিমানা, ডাম্পিংয়ে পাঠানোসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি-এর মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, লক্কড়ঝক্কড় মেয়াদোত্তীর্ণ বাসের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমানে নতুন বাসে কোনো বিনিয়োগ নেই। মূলত সড়কে চাঁদাবাজি, নিবন্ধন, রোড পারমিটসহ নানা জটিলতা এবং পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা এ খাতে আসছেন না। সড়কে নামছে না নতুন বাস। ফলে দিন দিন বেড়েই চলেছে লক্কড়ঝক্কড় বাসের সংখ্যা। পরিস্থিতির উন্নয়নে পরিবহন খাতে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে লক্কড়ঝক্কড় বাসের জঞ্জাল থেকে মুক্তি মিলবে না।
কেকে/এলএ