শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম: আটত্রিশ জেলার রদবদল কারা প্রশাসনে তোলপাড়      নীরবে বাড়ছে এইডসের প্রকোপ      ঝুলে আছে ক্রসফায়ারে হত্যার বিচার      বিচারের নামে বর্বরতা      ভূমি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চাইল মন্ত্রণালয়      অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ভারত : রণধীর জয়সওয়াল      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      
খোলাকাগজ স্পেশাল
নীরবে বাড়ছে এইডসের প্রকোপ
শরীফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ১০:২৫ এএম আপডেট: ০৬.০৬.২০২৬ ১১:৫৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশজুড়ে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে এইচআইভি (এইডস) ভাইরাসের সংক্রমণ। সম্প্রতি কুমিল্লায় মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা এই চোখ রাঙানিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরে এ নিয়ে কুমিল্লায় মোট সাতজন এইডস রোগীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, কেবল কুমিল্লা নয়, দেশের একটি বড় অংশজুড়েই অলক্ষ্যে বাড়ছে এই মরণব্যাধির প্রকোপ, যা দ্রুত প্রতিরোধ করা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত) দেশে এইডসে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৮৯ সালে দেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্তের পর থেকে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৮৬ জনের, যার অর্ধেকেরও বেশি মারা গেছেন গত ১০ বছরে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মৃত্যুর মিছিল দ্রুত দীর্ঘ হচ্ছে; যেখানে ২০২১ সালে মৃত্যু হয়েছিল ২০৫ জনের, তা ২০২৩ সালে এসে রেকর্ড ২৬৬ জনে পৌঁছেছে। চিকিৎসকদের মতে, শনাক্তের বাইরে থাকা রোগীরাই এই নীরব মৃত্যুর হার বাড়িয়ে তুলছে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে শনাক্ত হয় ১ হাজার ৪৩৮ জন। ২০২৫ সালে শনাক্ত হয় ১ হাজার ৮৯১ জন। ২০২৫ সালে এইডসে আক্রান্তদের ৪২ দশমিক ০৪ শতাংশ অবিবাহিত। আগের বছর এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ২০১৯ সালে এটা ছিল ১৯ শতাংশ। ওই বছর বিবাহিত ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিতদের হার ১০ শতাংশ বেশি; ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে। এইডস শনাক্তদের ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ। ১০-১৪ বছর বয়সী ০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

কুমিল্লায় ৫ মাসে ৭ জনের মৃত্যু: কুমিল্লায় মে মাসে এইচআইভি সংক্রমণে বা এইডসে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর জেলায় মোট সাতজনের মৃত্যু হলো। মে মাসের ৮, ১৩ ও ২৫ তারিখে এ তিনজনের মৃত্যু হয় বলে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং (এইচটিসি) এবং অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টারের কাউন্সেলর কাম অ্যাডমিন মো. আরিফ হাসান জানান। তিনি বলেন, মৃতদের বয়স ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তারা সবাই কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা।

মারা যাওয়া এক যুবকের স্ত্রী বলেন, তার স্বামী কুমিল্লা ইপিজেডের একটি কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তিনি আগেই এইচআইভি পজিটিভ হলেও বিয়ের সময় জানাননি। পরে স্বামীর মৃত্যুর আগে ঢাকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিষয়টি তারা জানতে পারেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর কুমিল্লা মেডিকেলে পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারেন, তিনি নিজেও এখন এইচআইভি পজিটিভ। এমন তথ্য দিয়ে এই নারী বলেন, বর্তমানে শ্বশুরবাড়ির বাধা উপেক্ষা করেই তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছেন। তাদের একটি শিশু সন্তান আছে, তবে শিশুটি এইচআইভি আক্রান্ত নয়।

হাসপাতালের এইচটিসি এবং এআরটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এইচআইভি সংক্রমণে এ বছরের জানুয়ারিতে দুইজন, মার্চে একজন এবং এপ্রিলে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে জেলায় ৩৮৫ জন এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৬৭২টি নমুনা পরীক্ষায় ৩৭ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের টিউবারকুলোসিস (টিবি) সংক্রমণও রয়েছে।

এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর মো. আরিফ হাসান বলেন, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৬৪৬টি পরীক্ষায় ২৭৮ জন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৩ জন চিকিৎসা বন্ধ করেছেন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কুমিল্লা এআরটিতে ২০১৯ সালের ২২৬টি পরীক্ষায় ১৫টি পজিটিভ, ২০২০ সালে ৩১১টি পরীক্ষায় ৮টি পজিটিভ, ২০২১ সালে ৪৯৮টি পরীক্ষায় ১৪টি পজিটিভ, ২০২২ সালে ৭৮৬টি পরীক্ষায় ২১টি পজিটিভ, ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৩০টি পরীক্ষায় ৪৮ জন পজিটিভ, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৮১টি পরীক্ষায় ৫৮ জন পজিটিভ, ২০২৫ সালে ১ হাজার ৪৪২টি পরীক্ষায় ৭২টি পজিটিভ এবং ২০২৬ সালের ৫ মাসেই ৬৭২টি পরীক্ষায় ৩৭টি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, সংক্রমণের এই হার ঊর্ধ্বমুখী।

আরিফ বলেন, ‘সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংক্রমণের ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণের ঘটনা বেশি ছিল, বর্তমানে যৌন সংক্রমণের মাধ্যমেই বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে।’

তিনি জানান, শনাক্তদের মধ্যে পুরুষ-পুরুষ যৌন সম্পর্কের ইতিহাস রয়েছে এমন ৯১ জন, পুরুষ যৌনকর্মী ৪০ জন, বিদেশফেরত ৪৯ জন, বিবাহিত সঙ্গীর মাধ্যমে সংক্রমিত ৪১ জন এবং নারী যৌনকর্মীর মাধ্যমে সংক্রমিত ২১ জন রয়েছেন। বাকিরা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত।

হাসান আরও বলেন, এইচআইভি আক্রান্তদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধ দেওয়া হয়। নিয়মিত চিকিৎসা নিলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেন্টারে কর্মরত কিছু স্বাস্থ্যকর্মীর বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে, যদিও তারা সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান এ কর্মকর্তা।

এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল ০ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১ শতাংশে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশনের (এএইচএফ) কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। এছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য শ্রেণির মানুষ।

দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বিমানবন্দরেও নেই পরীক্ষা ব্যবস্থা। অনেকেই বিদেশ থেকে আক্রান্ত হয়ে এলেও নেই শক্ত নজরদারি।

শরীরে মরণব্যাধি এইচআইভি (এইডস) ভাইরাসের উপস্থিতি টের পেয়েছিলেন বছর দুয়েক আগেই। কিন্তু সমাজে একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয় আর চরম লোকলজ্জার কারণে বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য ‘রাকিব হোসেন’ (ছদ্মনাম)। চিকিৎসকের কাছে যাননি, পরীক্ষা করাননি পরিবারকেও। ফল যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে; রোগটি গোপন রাখার লুকোচুরিতে নিজে যেমন আজ মৃত্যুর মুখোমুখি, তেমনই অজান্তেই এই ভাইরাসে সংক্রমিত করেছেন তার স্ত্রীকেও।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশে এইডস পরিস্থিতির বর্তমান ভয়ংকর রূপের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই ‘সামাজিক ট্যাবু’ ও লোকলজ্জা। চিকিৎসকেরা বলছেন, এইডস নিয়ে সামাজিক কুসংস্কারের কারণে রোগীরা লক্ষণ থাকার পরও পরীক্ষা করাতে ভয় পান। আর এই লুকোচুরির আড়ালেই পরিবার ও সমাজে নীরবে ডালপালা মেলছে এই মরণব্যাধি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছরই এইডসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা পূর্বের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে দেশে যতজন এইডস রোগী সরকারি নজরদারিতে বা চিকিৎসার আওতায় আছেন, তার চেয়ে দ্বিগুণ মানুষ সমাজে শনাক্তের বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইডস ছড়ানোর পেছনে সাধারণ মানুষের ধারণা কেবল ‘অবাধ যৌনাচার’। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হলে তাকে অপরাধী হিসেবে দেখা হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চরম লোকলজ্জায় রোগটি লুকিয়ে রাখেন। আর এই লুকোচুরির কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সময়মতো অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি বা চিকিৎসা পাচ্ছেন না, যা তাদের দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের শরীরেও অলক্ষ্যে ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ রাশেদ রাব্বি সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খুব বেশি সময় লাগে না। যেসব দেশে এইডস বেশি, সেখান থেকে যারা আসবে, তাদের জন্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তারা বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় স্যাম্পল দিয়ে যাবে। তাদের কন্টাক্ট নম্বর রেখে দেওয়া হবে। পরীক্ষার রেজাল্ট মোবাইলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে। কেউ আক্রান্ত হলে তাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং তার দ্বারা অন্য কেউ যাতে আক্রান্ত না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-এর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক জানান, সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এইডসে এখন আর নিশ্চিত মৃত্যু নয়। ১৯৮৪ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীও এখন সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। সঠিক চিকিৎসায় এটি এখন ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বর্তমানে এমন ইনজেকশনও বের হয়েছে, যা বছরে একবার নিলেই সারা বছর ভালো থাকা যায়।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  এইডস   প্রকোপ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close