মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় থামেনি ইসরাইলের হামলা, বাড়ছে হতাহত      জাতীয় সংসদে পাস হলো অর্থবিল-২০২৬      লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার মানুষ পানিবন্ধি      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু      এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব      ‘যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে’      একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই      
দেশজুড়ে
মামলা করাই যার নেশা, রেহাই পাননি মুয়াজ্জিনও
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ১০:৪২ এএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দায়ের করা একটি মামলাকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক বলে অভিযোগ করেছেন মামলার আসামিপক্ষ ও স্থানীয় গ্রামবাসী। তাদের দাবি, প্রকৃত বিরোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন নিরীহ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলার দেহুন্দা ইউনিয়নের ভাটিয়া মীরপাড়া গ্রামের মো. নজরুল ইসলাম কান্তু কিশোরগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি সি আর মামলা দায়ের করেন। মামলায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, মারধর এবং নারীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনা হয়। তবে মামলার আসামি ও স্থানীয় বাসিন্দারা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো বলে দাবি করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নজরুল ইসলাম কান্তুর সঙ্গে তার ভাতিজা মোহাম্মদ বিলাল হোসেনের মধ্যে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিকবার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, থানা-পুলিশ এবং মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের উদ্যোগে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন বৈঠকে উভয় পক্ষকে জমি জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করে বিরোধ নিষ্পত্তির পরামর্শ দেওয়া হয়।

স্থানীয় যুবক নাদিম জানান, জমি নিয়ে বিরোধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পরামর্শ দেয়। পরে থানা ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসে একাধিক সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে একজন আমিনের মাধ্যমে জমি পরিমাপ করে যার বৈধ মালিকানা প্রমাণিত হবে, তাকেই জমির ভোগদখল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তিনি জানান, সালিশে উভয় পক্ষই মুচলেকা দিয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই আবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। নাদিমের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদেরও মামলায় জড়ানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাদীর হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ আনা হলেও এর পক্ষে কোনো চিকিৎসা নথি বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই বলে দাবি করেন তিনি।

সংঘর্ষে আহত প্রতিবন্ধী তরুণী খুকু মনি অভিযোগ করেন, জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে একদল লোক তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে তাদের রক্ষা করেন। তবে যারা সহায়তা করেছিলেন, তাদের অনেককেই এখন মামলার আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে নজরুল ইসলাম কান্তু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছেন বলেও দাবি করেন।

স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, “আমি জমি বিরোধের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই। তারপরও অতীতে একটি চাঁদাবাজি মামলায় আমাকে আসামি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। বর্তমান মামলাতেও নিরপরাধ ব্যক্তিদের জড়ানো হয়েছে বলে আমি মনে করি।”

একই ধরনের অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দা জুলহাস মিয়া। তিনি বলেন, “আমার সঙ্গে বাদীর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। তারপরও বিভিন্ন সময়ে আমাকে এবং আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানাই।”

বাদীর ভাতিজা মোহাম্মদ বিলাল হোসেন বলেন, “আমার পিতার মৃত্যুর পর থেকেই জমি নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে বহুবার সালিশ হয়েছে। বিভিন্ন সালিশে জমির দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য কাগজপত্র বা প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়নি। এরপরও জোরপূর্বক ঘর নির্মাণের চেষ্টা করা হলে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।”

এলাকার জামাতা আনোয়ার হোসেন বলেন, “ঘটনার সময় আমি শুধু দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া থামানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমাকে মামলার প্রধান আসামিদের একজন করা হয়েছে। এটি আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও হয়রানিমূলক।”

স্থানীয় নারী জোবেদা বেগম বলেন, “জমি নিয়ে বহুবার সালিশ হয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত মেনে চলেনি। এর ফলে বিরোধ আরও জটিল হয়েছে। মামলা-পাল্টা মামলা ও উত্তেজনার কারণে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।”

এদিকে মামলার আসামিপক্ষ ও এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, জমি বিরোধের সুযোগ নিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মামলার বাদী নজরুল ইসলাম কান্তু। তিনি বলেন, “জমিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে সালিশ ও দরবার করে আসছি। একাধিক সালিশের পর থানায় অনুষ্ঠিত বৈঠকেও আমার জমির দাবির পক্ষে সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। তবে প্রতিপক্ষ সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।”

তার দাবি, “আমার ভাতিজা আমার জমিতে ঘর নির্মাণের চেষ্টা করে। আমি বাধা দিতে গেলে তারা আমাকে মারধর করে হাসপাতালে পাঠায়। পরে আমার বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করা হয়। ঘটনার পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ আদালতে দাখিল করেছি এবং থানায়ও লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।”

উপজেলার দেহুন্দা ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, “এটি চাচা-ভাইপোদের দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধ। কান্তু, হানিফ ও বিলালের মধ্যে এ নিয়ে অনেকদিন ধরে ঝামেলা চলছে। তবে মারামারির সময় আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না। তাই কার দোষ বা ঘটনার বিস্তারিত বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না।”

স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের জেরে মামলা-পাল্টা মামলা ও সামাজিক বিভক্তি বাড়ছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এমরানুল কবির বলেন, “মামলা যেহেতু হয়েছে, এখন তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যারা জড়িত প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে। আর যারা জড়িত নয়, তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট হওয়ার প্রশ্নই আসে না।”


আরও সংবাদ   বিষয়:  মামলা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close