কারা প্রশাসনে ৩৮ জেলারকে রদবদল করা হয়েছে। এক সঙ্গে এত কর্মকর্তার এটিই প্রথম আদেশ বলে সূত্র জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবারের এ ঘটনায় তোলপাড়ের পাশাপাশি বিভিন্ন কারাগারে স্বস্তি ও নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। অনেকেই রদবদলের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রজ্ঞাপনকে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন এনডিসি পিএসসির কঠোর বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন কারাগারে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়ানো কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের জন্য এটি সতর্কবার্তা। সূত্র মতে, রদবদল হওয়া ৩৮ জেলারের মধ্যে ২০ জন রুটিন, ৩ জন আবেদন ও ১৫ জন প্রশাসনিক কারণে বদলি হয়েছেন। ৩৮ জনের মধ্যে ১৮ জন ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। অপরদিকে, একই দিন ৮ ডেপুটি জেলারকে ভারপ্রাপ্ত জেলার ও উপ-তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দিয়ে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
জানা যায়, ০৪-০৬-২০২৬ বৃহস্পতিবার কারা অধিদপ্তরের ৪৪.০৭.০০০০.০২২.০১.০০৩.২০২৬-২১৭ স্মারকে ৩৮ জেলার ও উপ-তত্ত্বাবধায়ক রদবদলের প্রজ্ঞাপনে আইজি প্রিজন্স সই করেন। কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২ এর জেলার মো. দিদারুল আলমকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মোহাম্মদ মাহবুব কবিরকে মাদারীপুর জেলা কারাগার-১ এর জেলার, বান্দরবান জেলা কারাগারের জেলার নাশির আহমেদকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১ এর জেলার, কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারের জেলার এ জি মাহমুদকে শরীয়তপুর জেলা কারাগারের জেলার, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক নূর মোহাম্মদ মৃধাকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২ এর জেলার, কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১ এর জেলার ফারহানা আক্তারকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর উপ-তত্ত্বাবধায়ক, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. মোশফিকুর রহমানকে একই কারাগারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক রিজিয়া বেগমকে হসপিটালাইজড প্রিজনার্স সিকিউরিটি ইউনিটের (এইচপিএসইউ) জেলার, গাজীপুর জেলা কারাগারের জেলার সর্বোত্তম দেওয়ানকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের জেলার, টাঙ্গাইল জেলা কারাগারের জেলার মুহাম্মদ জাহেদুল আলমকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার, খুলনা জেলা কারাগার-১ এর জেলার মুহাম্মদ মুনীর হোসাইনকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারের জেলার, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর জেলার মো. আবুল হোসেনকে ভোলা জেলা কারাগারের জেলার, কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রাজশাহীর জেলার মো. মনির হোসেন চৌধুরীকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১ প্রেষণে কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উপ-তত্ত্বাবধায়ক, বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেলার খোন্দকার মো. আল-মামুনকে ফরিদপুর জেলা কারাগারের জেলার, ফরিদপুর জেলা কারাগারের জেলার মনির হোসেনকে লক্ষীপুর জেলা কারাগারের জেলার, সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের জেলার মো. মনির হোসেনকে কারা অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কারা মহাপরিদর্শক, শরীয়তপুর জেলা কারাগারের জেলার আসমা আক্তারকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এর জেলার মো. আব্দুলাহীল ওয়ারেসকে নাটোর জেলা কারাগারের জেলার, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আরিফুর রহমানকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর জেলারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলা কারাগারের জেলার কাজী মাজহারুল ইসলামকে ফেনী জেলা কারাগার-১ এর জেলার, নেত্রকোনা জেলা কারাগারের জেলার মুহাম্মদ আবু সাদ্দাতকে বাগেরহাট জেলা কারাগারের জেলার, নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার মো. ফেরদৌস মিঞাকে পঞ্চগড় জেলা কারাগারের জেলার, গাইবান্ধা জেলা কারাগারের জেলার মো. আতিকুর রহমানকে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারের জেলার, নাটোর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার শেখ মো. রাসেলকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, লক্ষীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেলকে গাজীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, ভোলা জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার হুমায়ুন কবির হাওলাদারকে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, নীলফামারী জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মো. ফারুক হোসেনকে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার প্রেষণে খুলনা জেলা কারাগার-২ এর ভারপ্রাপ্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক, খুলনা জেলা কারাগার-২ এর ভারপ্রাপ্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক সৈয়দ হাসান আলীকে খুলনা জেলা কারাগার-১ এর ভারপ্রাপ্ত জেলার, পঞ্চগড় জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মো. আখেরুল ইসলামকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার সৈয়দ মো. জাবেদ হোসেনকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর ভারপ্রাপ্ত জেলার, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার আবু ইউসুফকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানিয়া জামানকে খুলনা জেলা কারাগার-১ এর ভারপ্রাপ্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক, প্রিজন্স ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ভারপ্রাপ্ত জেলার জাহাঙ্গীর আলমকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এর ভারপ্রাপ্ত জেলার, সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার দিলীপ কুমার রায়কে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার অর্পন চৌধুরীকে কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত জেলার, ফেনী জেলা কারাগার-১ এর ভারপ্রাপ্ত জেলার আলী আফজালকে নেত্রকোনা জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মনজুরুল ইসলামকে বান্দরবান জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার এবং মেহেরপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মো. জাহাঙ্গীর হোসেন শেখকে কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত জেলার হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
অপরদিকে একই দিন ৪৪.০৭.০০০০.০২২.০১.০০৩.২০২৬-২১৮ স্মারকে ৮ ডেপুটি জেলারকে ভারপ্রাপ্ত জেলার ও উপ-তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দিয়ে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পাবনা জেলা কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. মোমিনুল ইসলামকে মেহেরপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরাণীগঞ্জের ডেপুটি জেলার মোছাঃ রুকাইয়া পারভীনকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার প্রেষণে বগুড়া জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এর ডেপুটি জেলার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে নীলফামারী জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. হোসেনুজ্জামানকে মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরাণীগঞ্জের ডেপুটি জেলার মো. সাইদুল ইসলামকে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. আব্দুস সোবহানকে মৌলভীবাজার জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার, বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার কেরাণীগঞ্জের ডেপুটি জেলার সিরাজুস সালেহীনকে একই কারাগারের ভারপ্রাপ্ত উপ-তত্ত্বাবধায়ক এবং রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার স্বপন কুমার ঘোষকে সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, ৩৮ জেলারের রদবদল নিয়ে আইজি প্রিজন্স ঈদের ছুটির পর টানা ৩ দিন ফাইলে নোট দেওয়া থেকে শুরু করে তালিকা তৈরিতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করেন। বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রেকর্ড সৃষ্টি করা এ রদবদলের কাজ করা হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে শুক্রবার রাতে আইজি প্রিজন্স দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, যারা বিগত দিনে ভালো কাজ করেছেন, তারা মূল্যায়িত হয়েছেন। আর যারা প্রশাসনিক কাজে অদক্ষতা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড করেছেন বা সমর্থন করেছেন, তাদের কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ প্রায় ২২ মাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো কাজের মূল্যায়ন করেছি। পাশাপাশি খারাপ বা অনৈতিক কাজেরও ব্যবস্থা নিয়েছি। অনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।
জানা যায়, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় আমূল পরিবর্তন হয়ে ভালোই চলছে দেশের ৭৩টি চালু কারাগার। প্রায় ২২ মাসে ফিরেছে স্বচ্ছতা। কারা অধিদপ্তরের নতুন মেনু অনুযায়ী বন্দিরা প্রতিদিনই সুস্বাদু খাবার পাচ্ছেন। বন্দিরা এখন কম টাকায় কারা ক্যান্টিন থেকে বিভিন্ন খাবার ও পণ্য কিনতে পারছেন। জেল কোড অনুযায়ী সব ধরনের সুবিধা পেয়ে বন্দিরা খুবই খুশি। এবার কোরবানি ঈদের দিন আনন্দ উৎসবে মেতেছিলেন ৮১ হাজার ৫২৪ জন পুরুষ ও মহিলা বন্দি। তিন বেলা পরিবেশন করা হয় উন্নত খাবার। আয়োজন করা হয়েছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন খেলাধুলা। ফুল দিয়ে বরণ করে আপ্যায়ন করা হয় দর্শনার্থীদের। এছাড়া কারা অধিদপ্তর ও বিভিন্ন ডিআইজি প্রিজন্স অফিসসহ ৭৬ কারাগারের ১১ হাজার ৭৩৭ স্টাফের জন্য ঈদের দুপুরে ব্যবস্থা করা হয়েছিল উন্নত মানের খাবার। অন্যদিকে, আইজি প্রিজন্সের কঠোর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন বিভিন্ন বিভাগ ও কারাগারের ডিআইজি প্রিজন্স, অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রিজন্স, সিনিয়র জেল সুপার, জেল সুপার ও জেলার।
সূত্র জানায়, গত প্রায় ২২ মাসে নেওয়া কারা অধিদপ্তরের সব সিদ্ধান্তই ইতিবাচক। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। মিটিয়ে ফেলা হয়েছে দীর্ঘ দেড় যুগের নানা জঞ্জাল। সব কিছুই সম্ভব হয়েছে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনের কর্মদক্ষতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও কঠোরতার জন্য। গতি ফিরিয়ে এনে তিনি কারাগারগুলো ঢেলে সাজিয়েছেন। কমে গেছে নানা অপরাধ। সুফল ভোগ করছেন বন্দি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সূত্র মতে, কারাগারে ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধে আইজি প্রিজন্স কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। অধিনস্তদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে অপরাধ এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলে কেউ ছাড় পাবেন না।
কেকে/এলএ