মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬,
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় থামেনি ইসরাইলের হামলা, বাড়ছে হতাহত      জাতীয় সংসদে পাস হলো অর্থবিল-২০২৬      লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার মানুষ পানিবন্ধি      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু      এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব      ‘যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে’      একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই      
খোলাকাগজ স্পেশাল
চুক্তির ফাঁদে চাপে দেশ
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ৯:৫৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়, ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো দীর্ঘমেয়াদি দায় ক্রমেই বাড়ছে। ৪১ হাজার কোটি টাকার বিশাল ভর্তুকির বোঝা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বারবার ট্যারিফ সমন্বয় করেও লোকসানের ভার সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ঘিরে যে দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতির চক্র তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বের হয়ে আসা বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে ভুল পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি অসম চুক্তির কারণে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত দেশবাসীকে এ সংকটের মাশুল গুনতে হতে পারে।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি রেখে ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের আগের দাম বহাল রাখা হলেও অন্যান্য পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য হারে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পাইকারি ও সঞ্চালন পর্যায়েও খরচ বেড়েছে, যা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রস্তাবের তুলনায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কিছু ক্ষেত্রে বেশি হারে মূল সমন্বয় করায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।

পিডিবি সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ খাতে সাধারণত উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি তেলের দাম, ডলারের বিনিময় হার, ভর্তুকির চাপ এবং সিস্টেম লসসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড একটি মূল্য সমন্বয় প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীতে সেই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয় বিইআরসি। এবারে পিডিবির প্রস্তাবের তুলনায় চূড়ান্ত সমন্বয় কিছু ক্ষেত্রে বেশি হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার পুনর্মূল্যায়নের জন্য বিইআরসিকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে পিডিবি। প্রতিষ্ঠানটির মতে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের গ্রাহকদের আর্থিক চাপ থেকে রক্ষা করতে আবাসিক গ্রাহকদের নির্দিষ্ট দুটি স্তরের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

পিডিবি বলছে, গত এপ্রিল মাসে দাখিলকৃত ট্যারিফ প্রস্তাবে আবাসিক গ্রাহকদের লাইফ-লাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং প্রথম ধাপের (০-৭৫ ইউনিট) মূল্যহার অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। পিডিবির লক্ষ্য ছিল সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপের বোঝা না চাপানো।

অনেকের অভিযোগ, বিইআরসিতে এখনো আওয়ামী লীগের অনুসারী ও জামায়াত-সংশ্লিষ্ট লোকজন বসে আছেন। তারাই সরকারকে বিপদে ফেলতে কাজ করছেন। তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে প্রস্তাবের চেয়েও বেশি দাম বাড়িয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি বাজারে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। তবে অন্যায়ভাবে মূল্য বৃদ্ধি হলে সরকার নিশ্চয়ই কাজ করবে।

বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হঠাৎ বড় ধরনের হস্তক্ষেপ করলে অর্থনীতি ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ধীরে ধীরে বিকল্প জ্বালানি উৎস, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতীতের অনিয়ম ও উচ্চমূল্যের চুক্তিগুলোর বিষয়ে সরকার অবগত রয়েছে। তবে এসব সমস্যার সমাধান একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এর ফল পেতে সময় লাগবে।

ইতোমধ্যেই সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য আবাসিক লাইফ-লাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং প্রথম ধাপ (০-৭৫ ইউনিট) পর্যন্ত ব্যবহারকারীকে নতুন বাড়তি ট্যারিফের বাইরে রাখা হয়েছে; যা মোট গ্রাহকের প্রায় ৬৫ শতাংশ।

অন্যদিকে, অন্যান্য পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সঞ্চালন চার্জও প্রায় ২৩.৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য ৭ টাকা থেকে বেড়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে সঞ্চালন খরচ ৩১ পয়সা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৯ পয়সা হয়েছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেও বাংলাদেশ সরকার শুরুতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেলের দাম বাড়ানো থেকে বিরত ছিল। এপ্রিলের মাঝামাঝি কিছুটা সমন্বয় করা হয়, এরপর মে মাসে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুন মাসে এসে নতুন করে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হলেও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিজেল মূলত গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হওয়ায় এ খাতে ব্যয় স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের চাপ না পড়ে। অন্যদিকে, অকটেন ও পেট্রোল বেশি ব্যবহৃত হয় ব্যক্তিগত যানবাহনে, তাই সেখানেই সমন্বয় আনা হয়েছে।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গত এক থেকে দেড় দশক ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে ভয়াবহ দুর্নীতি ও লুটপাটের চক্র তৈরি করা হয়েছে, তা দক্ষ গণমাধ্যমের সামনে দিয়েই ঘটেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী অপরাধ ও দুর্নীতির গভীর চক্র থেকে পুরো খাতকে বের করে এনে সুস্থ ধারায় ফেরাতে সময় লাগবে। তবে বর্তমান সরকারের স্পিরিট বা সংকল্প অত্যন্ত পরিষ্কার। মন্ত্রী আরও জানান, সরকার একদিকে যেমন জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে; তেমনি বর্তমানের তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলোকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।

ক্যাপাসিটি চার্জের মরণফাঁদ : দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা যেখানে ১৮ হাজার থেকে ১৮,৫০০ মেগাওয়াট, সেখানে উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১,০০০ মেগাওয়াটে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত এই সক্ষমতার জন্য কেন্দ্রগুলো বছরের বড় সময় অলস পড়ে থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে নিয়মিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা সক্ষমতা ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তির মেয়াদ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হবে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও এসব কোম্পানিকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা দিতে হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় ছিল ৫,৪৫৩ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫,৪৫১ কোটি টাকায়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই ব্যয় ৫২,৬৮১ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচের মধ্যে প্রায় ৫ টাকা ৪৬ পয়সাই ব্যয় হচ্ছে এই অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ মেটাতে।

গ্রাহক পর্যায়ে প্রভাব ও সরকারি পদক্ষেপ

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বর্তমানে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৩ টাকায় কিনলেও গ্রাহক পর্যায়ে তা অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, যার ফলে বড় ধরনের লোকসান থেকে যাচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকার কিছু বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী বা ‘লাইফলাইন গ্রাহকদের’ জন্য বিদ্যুতের আগের দাম বহাল রাখা হয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৫ শতাংশই এই সুবিধার আওতায় পড়বেন। এছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে টিসিবি প্রকল্প ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বলবৎ রাখা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সংকট ও সমাধানের পথ

বিদ্যুৎ খাতের এ সংকট রাতারাতি কাটার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সামনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নতুন কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে। যেহেতু অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক, তাই চাইলেই সেগুলো দ্রুত বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা ধাপে ধাপে বেসরকারি নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও দুর্নীতি কঠোরভাবে দমনের পরামর্শ দিয়েছেন।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চুক্তি   ফাঁদ   চাপ   দেশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close