ক্ষমতাচ্যুত ও নিষিদ্ধ হওয়ার পর পুনরায় সংগঠিত হয়ে মাঠে ফেরার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় দলটি। এরপর শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে অথবা বিদেশে পালিয়ে যান। অনেকে গ্রেপ্তার হন। দলটির প্রায় সব পর্যায়ের নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। বন্ধ হয়ে যায় দলীয় কার্যালয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও প্রকাশ্যে শোডাউন নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীরা নানা কৌশলে পুনরায় রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খণ্ড খণ্ড মিছিল, ঝটিকা সমাবেশ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতির মধ্যেও দলটির তৃণমূল ও সমর্থক গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা বাড়তে থাকে। সম্প্রতি দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে বিশাল মিছিল-স্লোগানের মাধ্যমে তাদের অবস্থান প্রকাশ করছেন। কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। কেউ কেউ জামিনও পাচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দলটির নেতাকর্মীরা বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। জামায়াত ও এনসিপির অভ্যন্তরীণ বিভেদের সুযোগ নিয়েই রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা পুনরুদ্ধার করতে চায় আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি সরকার বেকায়দায় পড়বে— এমন হঠকারী কোনো কর্মসূচিতে যাওয়ার চিন্তা নেই দলটির।
নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচনের আগে সমর্থন পেতে বিএনপির নেতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নির্বাচনের পর চলাফেরা ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের ব্যাপারে অভয় দেন।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বিএনপি কিছুটা আত্মতুষ্টিতে ভুগছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজপথে দলটির উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বিএনপি রাজনৈতিক কার্যক্রমে অনেকটাই উদাসীন, তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতাও লক্ষণীয়। আর এ সুযোগেই আওয়ামী লীগ সক্রিয় হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীদের আশ্রয় নিচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তাদের প্রশ্রয়ে থেকে দলটির নেতাকর্মীরা সুসংগঠিত হয়ে রাজপথে বড় শক্তির মহড়া দিচ্ছেন। তা ছাড়া দল বাঁচাতে শীর্ষ নেতাদের দ্রুত মাঠে নামার জন্য তৃণমূলের তরফ থেকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে মাঠের রাজনীতিতে ফিরতে নানা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে রাজপথে জানান দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, সময়ের ব্যবধানে মিছিলে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ছে। গত মে ও জুন মাসেও ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, যশোর, কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ঝটিকা মিছিল করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময়ের ঘটনায় সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী নেত্রী, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি নির্দিষ্ট কিছু মামলায় জামিন পেয়েছেন। আরও মামলার আসামি থাকায় তিনি কারাগারে আছেন। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন মামলায় কারাগারে থাকা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাকর্মী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ বিদেশে থাকা নেতাকর্মীরাও দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হতে চান বলে জানা গেছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, আওয়ামী লীগ নিয়ে বারবার ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু দেশের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাছে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, সটকে পড়ল পুলিশ
গত শুক্রবার নোয়াখালীর সদর উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় মিছিলের শুরুতে পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে কর্মসূচি অব্যাহত থাকে। এ সময় কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক মিছিল নিয়ে বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন বলে জানায় স্থানীয়রা। যদিও ওই মিছিলের ঘটনায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২৪ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সুধারাম মডেল থানার ওসি মো. তৌহিদুল ইসলাম।
এদিকে, সম্প্রতি চট্টগ্রামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের ক্রমাগত ঝটিকা মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব ঘটনায় গত শুক্রবার নগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ) ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে বন্দর থানা পুলিশ।
গ্রেপ্তার এড়াতে কৌশল অবলম্বন
গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করছে আওয়ামী লীগ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির মিছিল ফেসবুকে বেশ ভাইরাল হচ্ছে। এতে করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের মিছিলে অংশগ্রহণ করা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে হচ্ছে মামলা। গ্রেপ্তার হচ্ছেন অনেক নেতা। তবে এবার গ্রেপ্তার ও মামলা এড়াতে কৌশল অবলম্বন করেছে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ। গতকাল কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ইউসুফপুরে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে মিছিল করে আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড পেজে মুরাদনগরে আওয়ামী লীগের মিছিল বলে প্রচার করে।
বিষয়টি ফেসবুকে প্রচার হলে ঘটনাস্থলে সেকেন্ড অফিসারের নেতৃত্বে পুলিশের ফোর্স পাঠান মুরাদনগর থানার ওসি আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। তিনি গিয়ে নিশ্চিত হন, মিছিলস্থল মুরাদনগর থেকে ২ কিলোমিটার দূরে দেবিদ্বারের ইউসুফপুর অংশে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের পলাতক এক নেতা জানান, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ তানভীর আহমেদ ফয়সাল, দেবিদ্বার বড়শালঘর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল, মুরাদনগরের নবীপুর পশ্চিম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন, ব্রাহ্মণ চাপিতলার আওয়ামী লীগ নেতা আল আমিনকে মিছিল-সমাবেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
স্থানীয়রা জানায়, মুরাদনগরে মিছিল করার সুযোগ পায়নি আওয়ামী লীগ। পরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির দেবিদ্বারকে টার্গেট করে মিছিল ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে দলটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব তারেক মুন্সী বলেন, মিছিলের বিষয়ে আমি অবগত নই।
রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন ঝটিকা মিছিলের উপস্থিতি শুধু সাংগঠনিক বার্তা নয়, বরং রাজনীতিতে ফের জায়গা করে নেওয়ার কৌশলগত প্রচেষ্টার অংশ। আবার সংগঠনটির নেতাকর্মীদের কারামুক্তি বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার একটা অংশ হতে পারে। জুলাই সনদসহ নানা ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থানও আওয়ামী লীগকে ধীরে ধীরে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।
অন্যদিকে, বিএনপি মনে করছে দেশে দক্ষিণপন্থি তথা ইসলামপন্থিদের মোকাবিলা করতে হলে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনীতির মাঠের বাইরে ঠেলে দেওয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নাও হতে পারে। এজন্য রাজনীতিতে একটি সহনশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে গত বুধবার ঠাকুরগাঁও সদরে এক নাগরিক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশে সুন্দর, সুষ্ঠু, সহনশীল ও উদারপন্থি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও জনগণের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণই তাদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নেবে।’ তবে তাঁর এ বক্তব্যের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। তা নিয়ে রাজনীতির অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সক্রিয় কার্যক্রমের বিষয়ে একটি গণমাধ্যমে কথা বলেছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি জানান, গণঅভ্যুত্থানের মুখে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর শেখ হাসিনা সেখান থেকেই দলের সব কার্যক্রম নিজে তদারকি করছেন।
নাছিম দাবি করেন, দলের সভানেত্রী দিন-রাতের একটি বড় অংশ হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং ফোন কলের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ দিচ্ছেন। এ কৌশলের কারণে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া অনেক নেতাকর্মী আবার সক্রিয় হয়ে উঠছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, ‘আমার মনে হয় শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ফেরা আর সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘কৌশলের অংশ হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে হয়তো তারা সংগঠিত হতে চেষ্টা করছে।’
কেকে/এলএ