কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় শতবর্ষী এক ব্যক্তির শেষ ইচ্ছা পূরণের দাবিতে ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। পরে স্থানীয় আলেম সমাজ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে পরিবারের সদস্যরা তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এবং স্বাভাবিক নিয়মে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেন।
রোববার (৭ জুন) দুপুরে উপজেলার পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব কাহেতেরটেকী মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বার্ধক্যজনিত কারণে ওই এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা শামসুদ্দিন (১০০) মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা গোসল, কাফন ও দাফনের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তবে একই সময় বাড়ির আঙিনায় ঢাকঢোল বাজানোর আয়োজন করা হয়। এমনকি কয়েকজনকে বাদ্যের তালে নাচতেও দেখা যায়। শোকাবহ পরিবেশে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখে স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই বিষয়টিকে ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, মরহুম শামসুদ্দিন ও তার পরিবার নেত্রকোনার প্রয়াত পীর গাজী আকবর আলী রিজভীর মুরিদ এবং রেজভীয়া সুন্নি তরিকার অনুসারী। দীর্ঘদিন ধরে তারা ওই তরিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
পরিবারের দাবি, জীবদ্দশায় শামসুদ্দিন মৃত্যুর পর ঢাকঢোল বাজিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই তাঁর ছেলেরা এমন আয়োজন করেন।
তবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় আলেম সমাজ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা পরিস্থিতি শান্ত করতে উদ্যোগী হন। তারা মরহুমের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। আলোচনায় অংশ নেন স্থানীয় আলেম মাওলানা তোফাজ্জল হক রাশেদী, মাওলানা মোবারক হোসাইন, মো. জহিরুল ইসলাম, মো. সোহানসহ এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিরা।
তোফাজ্জল হক রাশেদী বলেন, “ঘটনাটি জানার পর আমরা এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে মরহুমের ছেলে খায়রুল ইসলাম ও নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে বসি। কোরআন-হাদিসের আলোকে বিষয়টি তাদের সামনে তুলে ধরি। আলোচনা শেষে তারা নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেন এবং আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। পরে জানাজা ও দাফন ইসলামি বিধান অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা হয়।”
মরহুমের ছেলে খায়রুল ইসলাম ও নাজিমুদ্দিন বলেন, “আমাদের বাবা রেজভীয়া সুন্নি তরিকার অনুসারী ছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি মৃত্যুর পর ঢাকঢোল বাজিয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানানোর কথা বলে গিয়েছিলেন। আমরা শুধু তার সেই শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্যই এ উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তবে পরে স্থানীয় আলেম সমাজ ও এলাকাবাসী আমাদের সঙ্গে আলোচনা করলে আমরা বিষয়টি মেনে নিই এবং স্বাভাবিক নিয়মে দাফন সম্পন্ন করি।”
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশ করছেন। কেউ এটিকে মৃত ব্যক্তির শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়নের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ ধর্মীয় বিধান ও সামাজিক রীতিনীতির পরিপন্থী বলে মন্তব্য করছেন।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, “লোকমুখে বিষয়টি শুনেছি। তবে এ ঘটনায় কেউ থানায় কোনো অভিযোগ বা তথ্য দেয়নি। তারপরও ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নেই এবং পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে।”
কেকে/এমএ