বৃক্ষের কাছে মানুষের ঋণ আজীবনের। বিভিন্ন সময়ে জ্ঞানী-গুণীরা সে অবদানের গানই গেয়েছেন বার বার। বৃক্ষ বন্দনা কবিতায় নানা বিশেষণে গাছের মহত্ব তুলে ধরেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এছাড়া বড় বড় শিল্পীরা তাদের কথায়, লেখায়, শিল্পকর্মে বৃক্ষের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে গেছেন নানাভাবে। তবে কেউ কেউ এমনও আছেন, যারা সবকিছু উপেক্ষা করে প্রকৃত অর্থেই আপন করেছেন বৃক্ষকে। অনুধাবন করেছেন এটির মর্ম। এমনই এক ব্যক্তির দেখা মেলে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁতে। তার নাম আরিফুর রহমান আরিফ। তিনি রাইগাঁ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ।
সবুজ বিপ্লবী বৃক্ষপ্রেমী অধ্যক্ষ আরিফুর রহমান উত্তরের ১৬ জেলায় প্রায় ৬০ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিতরণ ও রোপণ করেছেন। সম্প্রতি উত্তরের গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফলদ, ফুল, ঔষুধি ও বনজ প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপন ও বিতরণ করেছেন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেজ উদ্দীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গাছ রোপণও বিতরণ করেছেন। এছাড়া মসজিদ, মন্দির, গীর্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কলেজেও গাছ রোপণ করেন।
সবুজের ফেরিওয়ালা খ্যাত আরিফ একই সাথে নওগাঁ সদর উপজেলার হাসাইগাড়ি বিল, সান্তাহার রেলস্টেশন, পত্নীতলা নদীর পশ্চিম পাসসহ বিভিন্ন জায়গায় কৃষ্ণচূড়া চত্তর ও সিলিমপুরসহ অনেক জায়গায় বনায়ন করেছেন। গাছ পাগল এ মানুষটি নিজস্ব অর্থায়নেই বৃক্ষ বিতরণ ও রোপণ করে চলেছেন।
আরিফুর রহমান বলেন, ‘নিজের ভাললাগা থেকেই বন্ধুদের নিয়ে ছাত্রজীবনে এলাকায় কয়েক হাজার তালবীজ রোপণ করেছি। যা বর্তমানে তালপার্ক নামে পরিচিত। নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার ডাবরকুড়ি থেকে মহাদেবপুরের শেষ অংশ পয়নারী পর্ষন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার রাস্তার দুই ধারে কৃষ্ণচুড়া, রাধাচূড়া, পলাশ, শিমুলসহ নানা ফুলের ও ফলের গাছ রোপণ করেছি। যা কৃষ্ণচুড়া ভ্যালি নামে পরিচিত। এছাড়া রাস্তার পাসে, সরকাররি বেসরকারি খাস জায়গায়, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অজস্র গাছ রোপণ করেছি।’
আরিফুর রহমান স্বপ্ন দেখেন সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের ও গাছের পাতায় পাতায় স্বপ্ন বোনের আর সবুজের রেখা আকেন বাংলার মাটিও মানুষের অন্তরে অন্তরে।
তার বেতনের একটি অংশ জমা করেই সবুজের এ অভিযান পরিচালনা করছেন। একই সাথে সবাইকে এ চলতি বর্ষায় ৪টি করে গাছ লাগানোর অনুরোধ করেন। ভালোবেসে এই কাজ করেন বলেই যত্নের ক্ষেত্রেও কোনো কমতি রাখেন না তিনি।
শুধু বীজ বপনই নয়, নিজের শক্তি, সামর্থ্যের মধ্যে এসব গাছের পরিচর্যাও করেন। অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরার পথে এই কাজ করতে তার ক্লান্তি আসেনি কখনো। বরং বাড়াতে চান কাজের পরিধি। সেই চেষ্টাও করে চলেছেন ইতোমধ্যে।
তার কথা একটাই- মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্যের কল্যাণে নিজের আনন্দ খুঁজে নেওয়া। তাই মানুষের ছায়াহীন জীবনে আবার ছায়া ফিরিয়ে আনাই আপাতত মূল লক্ষ্য তার।
আরিফুর রহমান বলেন, ‘কেউ সারাজীবন বেঁচে থাকে না আমিও না। তবে আমি বেঁচে না থাকলেও আমার গাছগুলো বেঁচে থাকবে। সবাইকে জানাতে চাই গাছের উপকারিতা ও গুরুত্ব।’
এখন ধীরে ধীরে সেটি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বলেই আরিফের মুখজুড়ে প্রশান্তির ছায়া।
কেকে/এমএ