লালপুরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দীর্ঘদিনের সংকট ইতোমধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের ঘটনা বাড়ছে, যার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
নাটোরের লালপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিস সূত্রে জানা যায়, এখানে ৭০ হাজার ৬৮১ জন সক্ষম দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের আওতায় রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৪৫৮ জন নারী ‘সুখী’ বড়ি ব্যবহার করেন, ৬ হাজার ১০২ জন কনডম, ১১ হাজার ২৮ জন ইনজেকশন, ৯৯৭ জন কপার টি এবং ৩ হাজার ৯৮০ জন ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করেন।
তবে ২০২৪ সালের শুরু থেকেই ধীরে ধীরে এসব সামগ্রীর সংকট দেখা দেয় এবং বর্তমানে তা চরম আকার ধারণ করেছে। এখন সরকারি পর্যায়ে কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মজুদ নেই। ফলে পরিবার কল্যাণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ) হাবিবা খাতুন জানান, সামগ্রীর অভাবে তার কর্ম এলাকায় ৪৫ বছরের বেশি বয়সী একাধিক নারী অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গর্ভধারণ করেছেন। পরে অনেকেই বাধ্য হয়ে গর্ভপাত করিয়েছেন, যা তাদের জন্য সামাজিক ও মানসিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
উধনপাড়া গ্রামের ৪৪ বছর বয়সী এক নারী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, তিনি নিয়মিত সরকারি ইনজেকশন গ্রহণ করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ইনজেকশন না পাওয়ায় তিনি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গর্ভবতী হন। পরে গর্ভপাত করালেও বর্তমানে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।
এছাড়া একাধিক নারী জানান, অনেক দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বাজার থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কিনে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরাও এসব বিষয়ে আগ্রহ দেখান না। ফলে তারা পুরোপুরি সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রায় দেড় বছর ধরে পরিবার কল্যাণ সহকারীরা বাড়িতে এলেও কোনো সামগ্রী সরবরাহ করতে পারছেন না, যা তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. তপন কুমার রায় বলেন, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর জন্য সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন সরবরাহ বন্ধ থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত এবং জন্মহার বৃদ্ধির মতো সমস্যা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএফপিও) মো. রায়হানুল হক জানান, স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতি হিসেবে কনডম, বড়ি ও ইনজেকশন এবং দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি হিসেবে ইমপ্ল্যান্ট ও কপার-টি বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া স্থায়ী পদ্ধতি নিয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ না থাকায় মাঠকর্মীরা বর্তমানে কেবল সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তিনি আরও বলেন, সামগ্রীর সংকটের পাশাপাশি জনবল ঘাটতিও রয়েছে, যা প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তাই জরুরি ভিত্তিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেকে/ এমএস