স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো পোশাক খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দীর্ঘসময় ধরে পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের কথা বলে আসছেন নীতিনির্ধারকরা। বিকল্প বাজার সৃষ্টি, নতুন পণ্যের উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে সুবিধা প্রদান এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা পরিকল্পনা ও ঘোষণা থাকলেও তার বেশির ভাগই কাগজে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, বিভিন্ন নীতিমালা, কৌশলপত্র ও পরিকল্পনায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, আইসিটি, সেবা, পাট ও পাটজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ এবং ইলেকট্রনিকস খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। বহুমুখীকরণের আলোচনা ও পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের জন্য চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। এ পরিস্থিতিতে বহুমুখীকরণ শুধু পরিকল্পনা ও কৌশলপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ, খাতভিত্তিক নীতি সহায়তা এবং নতুন বাজার সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এদিকে, নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে পোশাক শিল্পকারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই, যা সামনে আরও বাড়তে পারে। একাধিক সূত্রের দাবি, ঈদ উপলক্ষে কৌশলে সরকারি সহায়তায় শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের পর ঈদ-পরবর্তী কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পুনরায় ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এতে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করেছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এ নির্ভরতা কমাতে সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধশিল্প, আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে একই ধরনের নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে।
তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনার আলোকে এসব খাতের আংশিক রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক রপ্তানি বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে জাপানের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের আদলে ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট (ওডিওপি)’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হলে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ চুক্তির আলোচনা চলছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি সদস্য দেশসমূহ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ অন্যান্য সম্ভাব্য বাজারের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, টেকসই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে রপ্তানি নীতি ২০২৪-২০২৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রচলিত বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরে নতুন বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিআইএসভুক্ত দেশ এবং বিভিন্ন আফ্রিকান দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
মন্ত্রী বলেন, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও সিআইএসভুক্ত দেশগুলোতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ বাণিজ্য প্রতিনিধি দল পাঠানো হচ্ছে। একইসঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও সিআইএস অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সিআইপি মর্যাদা ও এক্সপোর্ট ট্রফি প্রদানের মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। রপ্তানিকারকদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কাঁচামাল আমদানিতে সহায়তার জন্য এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ‘৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট ঋণ তহবিল’ গঠন করেছে, যেখানে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা হয়েছে এবং বাণিজ্য উইংগুলো রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাংলাদেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ে কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জিসিসি, মার্কোসুরভুক্ত দেশ, রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কমে গেলে কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ও চাপের মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং প্রধান বাজারগুলোতে দুর্বল চাহিদার কারণে রপ্তানি খাতের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, আইসিটি ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাত সম্ভাবনাময় হলেও এসব খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মতো সমপর্যায়ের নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা পায়নি। ফলে রপ্তানি বহুমুখীকরণ প্রত্যাশিত গতি পায়নি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত উচ্চমাত্রার কেন্দ্রীভূত অবস্থায় রয়েছে এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর এই নির্ভরতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় রপ্তানি বহুমুখীকরণে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এডিবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উচ্চ আমদানি শুল্ক ও বিভিন্ন ধরনের প্যারা-ট্যারিফের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার তুলনামূলকভাবে বেশি সংরক্ষিত। ফলে অনেক উৎপাদক আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারেই পণ্য বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বন্দর সুবিধার সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল পরিবহন অবকাঠামোর কারণে রপ্তানি পণ্যের সরবরাহ সময় (লিড টাইম) ও উৎপাদন ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিম্ন হারও রপ্তানি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগারের অভাব এবং দক্ষ জনশক্তির ঘাটতির কারণে পণ্যের গুণগত মান ও উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে শক্তিশালী না করে বহুমুখীকরণ সম্ভব নয়। অথচ সহজ শর্তে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, উচ্চ সুদহার, মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যয় এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের দুর্বলতা নতুন রপ্তানি পণ্য তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বন্দর ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস, কাস্টমস জটিলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রপ্তানি সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। তবে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, আসিয়ান অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকার বাজারে প্রবেশের কথা বহু বছর ধরে আলোচিত হলেও এসব অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশের জন্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি, বাণিজ্য কূটনীতি এবং রপ্তানিকারকদের জন্য তথ্য ও বাজার সহায়তা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Center for Policy Dialogue (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম খোলা কাগজকে বলেন, আসন্ন বাজেটে রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষ কোনো পরিকল্পনার বিষয়টি এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি। তার মতে, রপ্তানি খাতকে বহুমুখী করতে হলে বিদ্যমান আর্থিক ও রাজস্ব নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব খাত দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা পেয়ে আসছে, সেগুলো একইভাবে বছরের পর বছর অব্যাহত থাকলে নতুন খাতের বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তাই পুরোনো খাতগুলোতে দেওয়া প্রণোদনা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য ও খাতে তা পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন।
ড. মোয়াজ্জেমের মতে, প্রণোদনা কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু চূড়ান্ত পণ্যকে বিবেচনায় নিলে হবে না। বরং কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিতরণ ও বিপণন পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করতে হবে। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা গেলে নতুন রপ্তানি খাতের বিকাশ এবং বাজার বহুমুখীকরণ ত্বরান্বিত হবে।
কেকে/এলএ