চট্টগ্রামে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি নগর ও জেলার জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। গত সাড়ে চার বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৯০৩ জন। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২২১ জন। আক্রান্তদের অনেকেই দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, কেউ কেউ আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন, আবার অনেক পরিবারকে ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম এলেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। সামনে বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় এবারও ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগাম প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮৪ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ১১৩ জন এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭১ জন। এ সময়ে একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যদিও চলতি বছরের আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকির মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে।
চট্টগ্রামে বছরভিত্তিক ডেঙ্গুর চিত্র
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ ওঠানামা করলেও রোগটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন। ওই বছর মারা যান ৪১ জন। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন। প্রাণ হারান ১০৭ জন। এটি ছিল চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে ৪ হাজার ৩২৩ জনে নেমে এলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৫। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন। ওই বছর ২৫ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ১৮৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত সাড়ে চার বছরে ২৮ হাজার ৯০৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয়ে বিপর্যস্ত বহু পরিবার
ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, এটি অনেক পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক দুর্ভোগও বয়ে এনেছে। রোগের তীব্রতা বাড়লে কয়েকদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। রক্তের প্লাটিলেট পরীক্ষা, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টেস্ট, ওষুধ, বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং কখনো আইসিইউ সেবার কারণে চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ডেঙ্গুর চিকিৎসা বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। অনেক পরিবারকে ধারদেনা কিংবা সঞ্চয় ভেঙে চিকিৎসার খরচ মেটাতে হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই ডেঙ্গুর আর্থিক ও মানবিক ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বর্ষাকে সামনে রেখে সতর্কবার্তা
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চলতি বছরের পাঁচ মাসে ১৮৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ জন করে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে বর্ষাকালে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ। এ রোগ থেকে বাঁচতে হলে মশার বিস্তার রোধ করতে হবে। মশা নিধনের দায়িত্ব পালন করে আসছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার জন্য করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
‘শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে শনিবার সকালে চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত সচেতনতামূলক র্যালির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, শুধু সরকারের উদ্যোগে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জনগণের সচেতনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যাবে না। প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসাবাড়ি, কর্মস্থল এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। কারণ, জমে থাকা পানিতেই এডিস মশা বংশবিস্তার করে।
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে নিয়মিতভাবে এ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
এডিস মশার বংশবিস্তার
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সচেতন থাকতে হবে। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করতে পারলেই ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ সম্ভব। তিনি জানান, এডিস মশা সাধারণত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। এয়ার কন্ডিশনারের ট্রে, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার, মাটির পাত্র, বালতি, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা, নারিকেলের মালা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারির খোলসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এ মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে। তার মতে, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, অফিস কিংবা আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করলে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস হয়ে যায়। জীবন রক্ষার স্বার্থে যে কোনো উপায়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মশারি ব্যবহারের মাধ্যমে ডেঙ্গু সংক্রমণ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
নগর ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতার পরীক্ষায় চট্টগ্রাম
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নয়। এটি নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নির্মাণাধীন ভবনের তদারকি এবং নাগরিক সচেতনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চট্টগ্রাম নগরে অসংখ্য নির্মাণাধীন ভবন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা, খোলা জায়গায় পরিত্যক্ত টায়ার ও প্লাস্টিকের পাত্র পড়ে থাকা এবং জলাবদ্ধতা এডিস মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে মশক নিধনের পাশাপাশি উৎসস্থল ধ্বংসের কার্যক্রমে গুরুত্ব না দিলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
কেকে/এলএ