কিশোরগঞ্জ জেলা শহরকে যানজটমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও পথচারীবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করেছে প্রশাসন।
বুধবার (১০ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শহরের গুরুত্বপূর্ণ কালীবাড়ী মোড় এলাকায় বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের শুরুতে কালীবাড়ী মোড় থেকে বড়বাজার মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট, অস্থায়ী স্থাপনা, টংঘর এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা হয়। এ সময় প্রশাসনের উপস্থিতিতে একাধিক অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ফুটপাত ছেড়ে নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অভিযানকালে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান মারুফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শরিফুল হক, কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা, কিশোরগঞ্জ পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শফিকুর রহমানসহ জেলা পুলিশ ও পৌরসভার অন্যান্য কর্মকর্তারা।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় পথচারীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে অনেককে সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছিল। পাশাপাশি শহরের অন্যতম ব্যস্ত এ এলাকায় যানজট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছিল। এসব সমস্যা নিরসনেই যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
অভিযান চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, ফুটপাত দখলমুক্ত হলে সাধারণ মানুষের চলাচল নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে, একই সঙ্গে শহরের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বিকল্প পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “শহরের যানজট কমাতে এবং মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের উদ্যোগ অবশ্যই ভালো। তবে দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পুনর্বাসনের সুযোগ থাকলে ব্যবসায়ীরাও নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।”
আরেক ব্যবসায়ী মো. সোহেল মিয়া বলেন, “অনেকেই দোকানের নির্ধারিত সীমানার বাইরে মালামাল রেখে ব্যবসা করছিলেন, এতে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হতো। প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে সবাই নিজ নিজ সীমানার মধ্যে ব্যবসা করলে শহরে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।”
পথচারী রোজিনা আক্তার বলেন, “ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় আমাদের বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে চলতে হতো। এতে সবসময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল। আজ ফুটপাত কিছুটা ফাঁকা হওয়ায় স্বস্তিতে হাঁটতে পেরেছি।”
শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, “স্কুল-কলেজে যাতায়াতের সময় ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে প্রায়ই সড়ক দিয়ে হাঁটতে হতো। দখলমুক্ত ফুটপাত পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তবে যাতে আবার দখল না হয়, সেদিকে প্রশাসনকে নজর রাখতে হবে।”
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এটি কোনো একদিনের অভিযান নয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হবে। অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা কিংবা স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা বলেন, “ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে প্রশাসনের অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হবে। তবে এ কাজ শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। জনসচেতনতা ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া স্থায়ীভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন। জনগণ যখন উপলব্ধি করবে যে নিজেদের স্বার্থেই ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখা প্রয়োজন, তখন এ উদ্যোগ আরও সফল হবে। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়েই জনস্বার্থে আইন প্রয়োগ করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের অভিযানে মূলত যেসব ব্যবসায়ী দোকানের নির্ধারিত সীমানার বাইরে অতিরিক্ত জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে। এটি কোনো একদিনের অভিযান নয়; ধারাবাহিকভাবে এ কার্যক্রম চলবে। সময় ও পরিস্থিতির কারণে আজ বড়বাজার এলাকার অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তবে পর্যায়ক্রমে শহরের অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
এদিকে শহরের বিভিন্ন স্থানে নদীর জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলার ইউএনও মো. কামরুল হাসান মারুফ বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কিশোরগঞ্জ পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিএস রেকর্ড যাচাই করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে কোনো স্থাপনা নদীর জায়গায় নির্মিত বলে প্রমাণিত হলে সেগুলোর বিরুদ্ধেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণের স্বার্থে নদীর সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নদীকে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, ফুটপাত ও নদী দখলমুক্ত করা গেলে কিশোরগঞ্জ শহরের পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নাগরিক সুবিধার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। একই সঙ্গে তারা উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবি জানিয়েছেন।
কেকে/ এমএস